Pages

Categories

Search

আজ- শনিবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা মাঠ প্রস্তুত শুক্রবার আম বয়ানের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্ব শুরু

SAMSUNG CAMERA PICTURES

SAMSUNG CAMERA PICTURES

হাসান মামুন, টঙ্গী থেকে: টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা মাঠ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বুধবার থেকে মুসল­ীদের আসা অব্যাহত। কাল শুক্রবার বাদ ফজর আম’বয়ানের মধ্যদিয়ে শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম ধাপ। আগামী ১০ জানুয়ারি রবিবার আখেরী মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে প্রথম ধাপ। চারদিন বিরতি দিয়ে ১৫ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় ধাপ। ১৭ জানুয়ারি আখেরী মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে ২০১৬ সালের বিশ্ব ইজতেমা সমাপ্ত হবে। মুসল­ীদের চাপ কমাতে ২০১১ সাল থেকে দুই পর্বে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এ বছর ২০১৬ সাল থেকে বিশ্ব ইজতেমাকে দুটি ভাগে ভাগ করে ১৬ জেলা এবং ২০১৭ সালে ৩২ জেলায় বিভক্ত করা হয়েছে। ১৯৬৬ সাল থেকে নিয়মিত ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এ বছরই ৪ভাগে ভাগ করে প্রথম ধাপে ১৭ জেলা, দ্বিতীয় ধাপে ১৬ জেলার মুসল­ীরা অংশগ্রহণ করবেন। স্বাধীনতার পর মহান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টঙ্গীর বিভিন্ন মৌজায় বিশ্ব ইজতেমার জন্য ১৬০ একর ভূমি বরাদ্দ দেন। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইজতেমাস্থলের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশে ইজতেমাস্থলের ব্যাপক উন্নয়নে রাস্তা-ঘাট, অসমতল ভূমি সমতল করণ, ৮হাজার পাকা পায়খানা, পাকা গোসলখানা, ওযুখানা, বিদেশী মুসল­্লীদের জন্য প্রয়:প্রণালী, রান্না-বান্না, থাকার জন্য স্থায়ী পাকা টিনসেড ঘর নির্মাণ, ইজতেমা সড়ক নির্মাণ, ড্রেন-কালভার্ট নির্মাণ ও অন্যান্য উন্নয়নের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। গাজীপুর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আলহাজ্ব এড. আ.ক.ম মোজাম্মেল হক এমপি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ে সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করছেন। তারা জানান, বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল­্লীদের সেবায় সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান নানা ধরনের সেবা প্রদানের মাধ্যমে প্রতিবছরের ন্যায় এবারো সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ কোটি টাকা ইজতেমার জন্য দিয়েছেন।
মুসল­ীদের সুবিধার্থে ৬ জানুয়ারী থেকে বিআরটিসি ২২৮টি স্পেশাল বাস সার্ভিস ১৯ জানুয়ারী পর্যন্ত চলবে। বিআরটিসির একটি সূত্র জানায়, ৬ থেকে ১৯ জানুয়ারী পর্যন্ত চলাচলকারী স্পেশাল বাসের মধ্যে ৩টি বাস বিদেশী মুসল­ীদের জন্য রিজার্ভ থাকবে। আব্দুল­াহপুর-মতিঝিল ভায়া ইজতেমাস্থল ২৯টি বাস, শিববাড়ী-মতিঝিল ভায়া ইজতেমাস্থল ১৩টি, টঙ্গী-মতিঝিল ভায়া ইজতেমাস্থল ১৭টি, গাজীপুর-চৌরাস্তা, মতিঝিল-ভায়া ইজতেমাস্থল ৬টি, গাবতলী-গাজীপুর ভায়া ইজতেমাস্থল ৫টি, গাবতলী-মহাখালী ভায়া ইজতেমাস্থল ৩৫টি, গাজীপুর-মতিঝিল ভায়া ইজতেমাস্থল ২৫টি, মতিঝিল-বাইপাল ভায়া ইজতেমাস্থল আরো ২০টি বাস চলবে। এছাড়া ঢাকা-নরসিংদী ভায়া ইজতেমাস্থল ২০টি, চট্টগ্রাম রোড-সাভার রোড ২০টি, ঢাকা-কুমিল­া রোডে চলবে আরো ১৫টি বাস।
অপরদিকে বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসলি­দের যাতায়াতে সুবিধার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ে ২৮টি বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করবে। এ ছাড়া সকল আন্ত:নগর, মেইল এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেনে অতিরিক্ত ২০টি কোচ সংযোজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, দুই ধাপের ইজতেমার প্রথম ধাপের শুক্রবার ঢাকা-টঙ্গী-ঢাকা দুটি ‘জুম্মা স্পেশাল, আখেরি মোনাজাতের আগের দু’দিন জামালপুর ও আখাউড়া থেকে দুটি করে চারটি অতিরিক্ত ট্রেন পরিচালনা করা হবে। আখেরি মোনাজাতের আগের দিন লাকসাম-টঙ্গী একটি, আখেরি মোনাজাতের দিন ঢাকা-টঙ্গী-ঢাকা সাতটি, টঙ্গী-ঢাকা সাতটি, টঙ্গী-লাকসাম একটি, টঙ্গী-আখাউড়া দুটি, টঙ্গী-ময়মনসিংহ চারটিসহ মোট ২১টি আখেরি মোনাজাত স্পেশাল ট্রেন চালু থাকবে। মুসল­ীদের সুবিধার্থে ১০ থেকে ১৭ জানুয়ারী ৭২৯/৭২২ মহানগর প্রভাতী/গোধুলী, ১১-১৮ জানুয়ারী সোমবার ৭০৭/৭০৮ তিস্তা এক্সপ্রেস এবং ৮-১৫ জানুয়ারী শুক্রবার ৭০১/৭০২ সুর্বন এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোতেও চলাচল করবে। বিশেষ ট্রেন চলাচলের সুবিধার্থে সুর্বন এক্সপ্রেস, তিস্তা এক্সপ্রেস, কালনী এক্সপ্রেস, মহুয়া এক্সপ্রেস, তুরাগ এক্সপ্রেস, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ কমিউটার, ঢাকা-টঙ্গী কমিউটার, ঢাকা-জয়দেবপুর কমিউটার, ঢাকা-কুমিল­া কমিউটার আখেরী মোনাজাতের দিন বন্ধ থাকবে। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড এর সদস্যরা তুরাগ নদীর ৯টি স্থানে (পন্টুন) ভাসমান সেতু নির্মানের কাজ সমাপ্ত করেছে।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, ইজতেমা মাঠে স্থাপিত ১২টি উৎপাদন নলকুপের মাধ্যমে প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি লিটারেরও বেশি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সকল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ওযু-গোসলের হাউজ ও টয়লেটসহ প্রয়োজনী স্থানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও পাকা দালানে প্রায় ৬ হাজারের মতো টয়লেট ইউনিট রয়েছে। এদের মধ্যে নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত ওযু গোসলখানা এবং টয়লেটগুলো ইতোমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন, র‌্যাব, পুলিশ, আনসার ভিডিপিসহ আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য ৫টি কন্টোল র“ম এবং র‌্যাব ও পুলিশের জন্য ১৪টি ওয়াচ টাওয়ার নির্মান, ২০টি ফগার মেশিন দিয়ে ইজতেমা ময়দানে মশক নিধন, ইজতেমা চলাকালিন সময়ে ২০টি ট্রাকের মাধ্যমে রাত দিন বর্জ্য অপসারন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা, ইজতেমা চলাকালিন রাতদিন ২৪ঘন্টা সিটিকর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ সেবা কার্যক্রম, ইজতেমা ময়দানে বিনা মূলে ৫৪টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র মুসল্লীদের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
ডেসকো’ কর্তৃপক্ষ জানান, ইজতেমা এলাকায় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের সকল প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়েছে। উত্তরা, টঙ্গী সুপার গ্রীড ও টঙ্গী নিউ গ্রীডকে মূল ১৩২ কেভি সোর্স হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। যে কোন একটি গ্রীড নষ্ট হলেও সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হবে না। ইজতেমা এলাকায় ৪টি ষ্ট্যান্ডবাই জেনারেটর এবং ৫টি ট্রলি-মাউন্টেড ট্রান্সফরমারও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানান, ইজতেমাস্থলে তাদের একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে সার্বক্ষণিক কর্মকর্তাসহ ফায়ারম্যানরা অবস্থান করবেন। ময়দানের প্রতি খিত্তায় ফায়ার ডিস্টিংগুইসারসহ ফায়ারম্যান, গুদাম ঘর ও বিদেশি মেহমান খানা এলাকায় ৩টি পানিবাহী গাড়ি, ৩সদস্যের ডুবুরী ইউনিট, ১টি স্ট্যান্ডবাই লাইটিং ইউনিট এবং ৫টি অ্যাম্বলেন্স থাকবে। সূত্র আরো জানায়, ইজতেমা মাঠের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রনে ইজতেমা মাঠের আশেপাশের এলাকায় পানি ছিটানো হবে।
টঙ্গী সরকারী হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, টঙ্গী সরকারী হাসপাতালে নিয়মিত শয্যা ছাড়াও অতিরিক্ত শয্যা বাড়িয়ে মুসল­্লীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ মেডিক্যাল অফিসারদের তালিকা ও ডিউটি রোস্টার করে চিকিৎসকদের সার্বক্ষনিক স্বাস্থ্য সেবা করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মু­সল্লীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতে মন্নু গেইট, এটলাস গেইট, বাটা কারাখানার গেইট ও টঙ্গী হাসপাতালমাঠসহ ৬টি অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এখানে হৃদরোগ, অ্যাজমা, ট্রমা, বার্ণ, চক্ষু এবং ওআরটি কর্ণারসহ বিভিন্ন ইউনিটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ চিকিৎসা দেবেন। রোগীদের হাসপাতালে নেয়ার জন্য সার্বক্ষণিক ১৪টি অ্যাম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ইজতেমা মাঠের দায়িত্বে নিয়োজিত মুরব্বী গিয়াসউদ্দিন জানান,তাবলীগ জামাতের উদ্যোগে প্রতিবছর এ ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। ইজতেমায় দেশি মুসল্লী ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশ থেকেই তাবলীগ জামাতের মুসল্লিরা অংশ নিয়ে থাকেন। প্রতিবারের মতো ইজতেমা মাঠের উত্তর-পশ্চিমাংশে বিদেশি মেহমানদের জন্য বিশেষ ভাবে টিনের ছাউনির মাধ্যমে পৃথক কামড়া তৈরি করা হয়েছে।
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ইজতেমা ময়দানে মুসল্লীদের নিরাপত্তায় সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আজ থেকে ৫ হাজার পুলিশ সদস্য ২৪ঘন্টা মুসল­ীদের নিরাপত্তাদানে নিয়োজিত থাকবে। এছাড়াও সাদা পোষাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পর্যাপ্ত সদস্য নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকবে।
গাজীপুর জেলা তথ্য কর্মকর্তা জানান, গতকাল ৬ জানুয়ারি গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্কা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বৃহত্তর জেলাগুলোর ঢাকাগামী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। এছাড়া দুই পর্বের আখেরি মোনাজাতের দিন গাজীপুরে বিভিন্ন সড়কেও যান চলাচল বন্ধ থাকবে।
ইজতেমায় দুই ধাপের আখেরি মোনাজাতের ১০ জানুয়ারি ও ১৭ জানুযারি দিন সকাল ৬টা থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ-টঙ্গী মহাসড়কের মাঝুখান ব্রিজ থেকে স্টেশনরোড ওভারব্রিজ পর্যন্ত সড়ক পথে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। টঙ্গীর কামারপাড়া ব্রিজ থেকে মুন্নু টেক্সটাইল মিল গেট পর্যন্ত সড়ক পথেও থাকবে একই নির্দেশনা।
গাড়ি পার্কিং : ইজতেমা চলাকালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন ১০ জানুয়ারি সকাল ৬টা থেকে বিভিন্ন স্থানে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চান্দনা চৌরাস্তা হয়ে আগত মুসল্লীদের বহনকারী যানবাহন পার্কিংয়ের জন্য মহাসড়ক পরিহার করে টঙ্গীর কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিল কম্পাউন্ড, মেঘনা টেক্সটাইল মিলের পাশে রাস্তার উভয় পাশে শফিউদ্দিন সরকার একাডেমি মাঠ প্রাঙ্গন, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠ, চান্দনা চৌরাস্তা হাইস্কুল মাঠ, তেলিপাড়া ট্রাকস্ট্যান্ড এবং নরসিংদী-কালীগঞ্জ হয়ে আগত মুসল­ী¬দের বহনকারী যানবাহন টঙ্গীর কে-টু ও নেভী সিগারেট ফ্যাক্টরি সংলগ্ন খোলা স্থান ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
৬ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা থেকে উল্লেখিত সড়ক পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। বৃহত্তর জেলাগুলো থেকে ঢাকাগামী সকল যানবাহন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী হয়ে ডিএমপি এলাকায় প্রবেশের পরিবর্তে চান্দনা চৌরাস্তা, কোনাবাড়ি, কালিয়াকৈর-চন্দ্রা, বাইপাইল, নবীনগর, আমিনবাজার হয়ে চলাচল করবে।