Pages

Categories

Search

আজ- শনিবার ১৭ নভেম্বর ২০১৮

শ্রীপুরে ছাত্রীকে শ্লীলতাহানীর অভিযোগে গ্রাম্য সালিসে যুবককে জুতারমালা পরিয়ে বেত্রাঘাত

শ্রীপুর প্রতিনিধি : গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর স্কুল ছাত্রীকে শ্লীলতাহানীর চেষ্টার অভিযোগে এক যুবককে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের উদ্যোগে গ্রাম্য সালিসে গলায় জুতার মালা দিয়ে পুরো গ্রাম ঘুড়িয়ে বেত্রাঘাত করে যুবকের জমি লিখে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অত:পর রাতে ওই যুবকের বিরুদ্ধে স্কুল ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

অভিযুক্ত যুবক উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের আব্দুল বারেক মিয়ার ছেলে আনোয়ার হোসেন (২৫)। সে স্থানীয় এসকিউ গ্রুপের এসকিউ ষ্টেশন (কালার মাষ্টার) নামক একটি সোয়েটার কারখানায় অপারেটর হিসেবে কাজ করে।

এলাকাবাসী ও স্কুল ছাত্রীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ৮ম শ্রেণীর ছাত্রীকে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসার পথে বিভিন্ন সময় উত্যক্ত করতো অভিযুক্ত যুবক আনোয়ার হোসেন। গত রোববার সন্ধ্যায় গৃহশিক্ষকের কাছ থেকে বাড়ি ফেরার পথে আনোয়ার হোসেন তাকে হাত ধরে টানাটানি করে। এসময় মেয়েটি চিৎকার শুরু করলে এলাকাবাসী এসে মেয়েকে উদ্ধার করেন। পরে মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটি স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্যের মাধ্যমে ইউপি চেয়ারম্যানকে জানালে, সন্ধ্যার পর রাত আটটার দিকে দুই জন গ্রাম পুলিশ ও দফাদার দিয়ে আনোয়ারকে রশি দিয়ে বেঁধে নয়াপাড়া বাজারের আব্দুস সামাদ মিয়ার দোকানের পাশে রেখে দফায় দফায় সারারাত মারধর করে। পরে এঘটনার বিচারের জন্য সোমবার বেলা ১১টার দিকে একই স্থানে ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম গ্রাম্য সালিসের আয়োজন করেন।এতে চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম, ৩নং ওয়ার্ড সদস্য মিজানুর রহমান, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ, স্থানীয় মাতাব্বর আব্দুল আওয়ালসহ গ্রামে বেশ কয়েজন লোকের উপস্থিতিতে আনোয়ার হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে কান ধরে উঠবস ও বাহুতে লাল রঙ্গের কাপড় দিয়ে বেঁধে গলায় জুতার মালা দিয়ে বেত্রাঘাত করতে করতে পুরো গ্রামে ঘুড়ানো হয়। এঘটনায় আনোয়ার হোসেন অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে, একটি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে আনোয়ার হোসেন, তার ভাই ছানোয়ার হোসেন ও তার মা চাঁন বানুর নিকট থেকে তাদের একমাত্র সম্বল দখলে থাকা ৫শতাংশ সরকারী খাস জমি মেয়ের নামে লিখে দেয়া হয়। অতপর রাতে ছাত্রীর নানা আফাজ উদ্দিন বাদী হয়ে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেনকে আসামী করে শ্রীপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

শ্রীপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বুলবুল বলেন, স্কুল ছাত্রীকে শ্লীলতাহানীর বিচার গ্রাম্য সালিসে হতে পারে না, এটা আপোষ অযোগ্য অপরাধ। পুলিশকে অবহিত করে তাদের হেফাজতে দেয়া উচিত ছিলো অভিযুক্ত আনোয়ারকে। কিন্তু স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মাতাব্বরগন নিজেরাই বিচার না করে আইন হাতে তুলে নিয়েছেন।

এবিষয়ে অভিযুক্তের ভাই সানোয়ার হোসেন বলেন, তার ভাইকে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে ধরে নিয়ে গ্রামের রাস্তায় তার গলায় জুতার মালা পড়িয়ে পুরো গ্রামে ঘোরানো হয়েছে। তাকে মারধরের ফলে সে এখন মুমুর্ষ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে। বিচারকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়ে ওই ছাত্রীর নামে ৫গন্ডা জমিও লিখে দিতে হয়েছে। এখন আবারো রাতে মামলা হওয়ায় গ্রেপ্তার আতংকে আনোয়ারকে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করাতে পারছি না। থানায় যেহেতু মামলাই করবে তাহলে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মাতব্বরা আমাদের উপর এমন নির্যাতন করলেন কেন? এঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।

ছাত্রীর মামা বলেন, ঘটনার পরপরই সু-বিচারের জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানাই। এরপর শালিস বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা আপোষ মীমাংসা করি। কিন্তু সোমবার রাতে শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক খন্দকার আমিনুর রহমান বাড়ীতে এসে থানায় অভিযোগ না দিয়ে কেন আপোষ মীমাংসা করা হয়েছে এবিষয়ে আমাদের ধমক দিয়ে মামলা করার পরামর্শ দিলে রাতে থানায় অভিযোগ দেয়া হয়।

গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৩নং ওয়ার্ড সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, অভিযোগ উঠায় ওই যুবককে চেয়ারম্যান ও এলাকার অন্যান্য গন্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সালিসে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে সেই মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তাকে পুলিশে না দিয়ে নিজেরাই বিচার করা ঠিক হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকার চেয়ারম্যান যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তাই হয়েছে। তার মতের বিরুদ্ধে আমরা যাইনি।

গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম বলেন, মেয়েটির বাবা-মা অন্যত্র বিয়ে করে ঘর সংসার করে মেয়েটি তার নানার আশ্রয়ে বড় হচ্ছে। সে তার নানার কাছে থেকেই লেখাপড়া করে। আমি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ওই মেয়ের ভবিষতের কথা বিবেচনা করে উভয়পক্ষের সম্মতিতে আনোয়ারদের দখলীয় ৫গন্ডা খাস জমি মেয়ের নামে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে লিখে দিতে সাহায্য করেছি মাত্র।

শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) খন্দকার আমিনুর রহমান বলেন, এবিষয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে, মামলা নং ৫০, ২৪.০৭.২০১৭ইং। তদন্ত পূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে।