Pages

Categories

Search

আজ- শনিবার ১৭ নভেম্বর ২০১৮

রাণীনগরে সোনালী আঁশ পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক

অক্টোবর ৩, ২০১৭
কৃষি, নওগাঁ
No Comment

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি : সোনালী আঁশের দেশ বাংলাদেশ। এক সময় বাংলাদেশের একমাত্র অর্থকরী ফসল হিসাবে চাষ করা হতো পাট। লাভও হতো অনেক। দেশের বাইরে বাংলাদেশের পাট ও পাট থেকে তৈরি পন্যগুলোর আলাদা কদর ছিলো। কারণ সেই সময়ে দেশের পাট শিল্পগুলো সচল ছিলো। বাংলাদেশের পাট দ্বারা তৈরি পন্যগুলো রপ্তানি করা হতো বিদেশ। তাই পাট চাষে কৃষকদের ছিলো ব্যাপক আগ্রহ।

কিন্তু কালের বির্বতনে আমাদের দেশ থেকে অন্যতম এই লাভজনক ফসলের চাষ হারিয়ে যেতে বসেছে। দিনের পর দিন পাটের মূল্যের দরপতনের ফলে এখন আমাদের কৃষি প্রধান দেশের কৃষকরা পাট চাষ থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই যতই দিন যাচ্ছে উপজেলায় কমছে পাটের চাষ। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মাঠে আর আগের মতো সবুজে ভরা পাটের ক্ষেত চোখে পড়ে না। পাটের জায়গা দখল করেছে অন্যান্য লাভজনক আবাদ বিশেষ করে বোরো ধান।

তাই বর্তমানে নওগাঁর অন্যান্য উপজেলার মতো রাণীনগর উপজেলায় বিলুপ্ত প্রায় এক সময়ের এদেশের প্রধান অর্থকারী ফসল সোনালী আঁশ হিসাবে খ্যাত পরিবেশ বান্ধব পাটের চাষ। বর্তমানে এই পাট চাষে কৃষক দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। উপজেলার বিভিন্ন মাঠে অল্প পরিমাণে বিক্ষিপ্ত ভাবে পাটের চাষ একটু চোখে পড়ে। কৃষকদের নিজের প্রয়োজনের কারণে খুবই কম পরিমাণ জমিতে চাষ করছেন এই পাট। উপজেলায় বাণিজ্যিক ভাবে আর পাট চাষ করে না কৃষকরা। ফলে এবার পাটের ভরা মৌসুমেও পাট মিলেনি উপজেলার হাট বাজার গুলোতে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকের সাথে আলাপকালে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে পাটের মূল্যের দরপতন, উৎপাদন খরচ বেশি ও পাট পচানো পানির অভাবেই কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ৬০ এর দশকে দেশের খ্যাতমান কয়েকটি পাটক্রয় কেন্দ্র ও শিল্প ছিল রাণীনগর উপজেলায়। এক সময় উপজেলার নামকরা সেই পাটক্রয় কেন্দ্রে পাটক্রয় করে নৌপথে পাঠানো হতো দেশ বিদেশের বিভিন্ন জুটমিলে। সে সময় সরকারী ও বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন শত শত টন পাট ক্রয় করা হতো চাষীদের নিকট থেকে। ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে কৃষকেরাও ঝুঁকে পড়তো ব্যাপকহারে পাট চাষে। রাণীনগর থেকে এ পাটগুলো দেশের দক্ষিণাঅঞ্চল জেলা খুলনা, যশোর সহ বিভিন্ন জুটমিলে নৌপথে ও রেলপথে নিয়ে যাওয়া হতো। জনশ্রæতি আছে শুধু দেশেই নয় বরং আকাশ পথেও রাণীনগরের পাট রপ্তানি করা হতো সেই ইংল্যান্ডে। সেই সময় মালবাহী উড়োজাহাজ যোগে রাণীনগর পাটক্রয় কেন্দ্র থেকে সরাসরি এই পাট লন্ডনে রপ্তানি করা হতো বলে তথ্যঅনুসন্ধানে জানা গেছে। আজ আর রাণীনগরে আগের মতো পাট চাষ হয় না। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ ব্যবহার করতে শুরু করে বিভিন্ন প্লাষ্টিকপন্য যা দখল করে নিয়েছে পাটের তৈরির পণ্যের জায়গা।

পাটের মূল্য কম সহ নানাবিধ সমস্যার কারণে কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এদিকে পাটের চাষ কম হওয়ায় জ্বালানীকাজে ব্যবহার্য পাটখড়ির মূল্য আকাশচুম্বি হয়েছে। ফলে মধ্যম আয়ের পরিবারে সৃষ্টি হয়েছে চরম ভোগান্তি। তবে পাট চাষ বৃদ্ধির লক্ষে সরকারের বিভিন্ন প্রদক্ষেপ গ্রহণ ও পাট মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আবার ফিরে আসতে পারে পাট চাষের সুদিন এমনই ধারনা এলাকাবাসীর।

উপজেলার একডালা ইউনিয়নের ডাকাহার গ্রামের শেখ মো: হাফিজার রহমান বলেন, বাপ-দাদার আমলে দেখেছি মাঠ জুড়ে শুধু পাটের ক্ষেত। চারিদিকে ছিলো শুধু সবুজ পাটের আবাদ। তখন পাট চাষ করে লাভও হতো অনেক। তাই সেই সময়ে কৃষকদের কাছে পাটের আলাদা এক কদর ছিলো। কয়েক দশক আগেও উত্তরাঞ্চলের মধ্যে রাণীনগর উপজেলা ছিল পাট চাষের জন্য বিখ্যাত। সে সময় আমার বাপ-দাদারা ব্যাপকহারে পাট চাষ করতেন। তাদের দেখাদেখি আমিও অনেক পরিমাণ পাট চাষ করতাম। কিন্তু দিনের পর দিন পাটের মূল্যের ব্যাপক হারে দরপতন হওয়ার কারণে পাট চাষে অনেক লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই বর্তমানে নিজেদের প্রয়োজনেই শুধু অল্প করে পাট চাষ করি। বর্তমানে উৎপাদন খরচ বেশি ও মূল্য কম হওয়ায় এলাকার চাষীরা পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের হরিশপুর গ্রামের কৃষক মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, গত দু বছর থেকে পাট চাষ করে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। পাট পঁচানোর পানি ও জায়গার অভাবে আমাদের চরম বিপাকে পড়তে হয়। এ জন্য এবার আমরা পাট চাষ করিনি। ওই জমিগুলোতে এবার ধান সহ অন্যান্য আবাদ করে লাভবান হচ্ছি। অপরদিকে পাটের মূল্যের দরপতনের কারণে আমরা পাট চাষে দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি।

উপজেলার শের-এ বাংলা (ডিগ্রি) মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোফাখ্খার হোসেন খাঁন পথিক বলেন, সরকারের অব্যস্থাপনার কারণে কৃষকরা আস্তে আস্তে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যান্য ফসলের চাষের বিষয়ে যে ভাবে কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করেন পাট চাষ নিয়ে তা করা হয় না। বর্তমানে শুধু ধান চাষ নিয়েই আমরা কৃষকদের মগজ ধোলাই করছি। কিন্তু ধানের তুলনায় পাটসহ হারিয়ে যাওয়া অন্যান্য ফসলগুলোও যে অনেক অর্থকরী ও প্রয়োজনীয় তা আমরা দিনের পর দিন ভুলে যেতে বসেছি। পাট চাষকে আবার আগের মতো ফিরিয়ে আনতে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে নতুন করে কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এই আবাদের জন্য কৃষকদেরকে ভুর্তকি প্রদান করতে হবে। এই রকম নানান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ ফিরিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা, এবার উপজেলার মোট ৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে। এই অঞ্চলগুলোতে মুলত ও-ফোর তোষা, মেশতা ও দেশি জাতের পাট বেশি চাষ করা হয়। তবে তোষা জাতের পাট অনেক মূল্যবান বলে কৃষকরা বর্তমানে এই জাতের পাটই বেশি পরিমাণে চাষ করেন। বর্তমানে প্রতি বিঘায় বিভিন্ন জাতের পাট চাষে মোট খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৫হাজার থেকে ৬হাজার টাকা। প্রতিবিঘা জমিতে অধিক ফলনশীল তোষা জাতের পাট উৎপাদন হয় প্রায় ৮ থেকে ১০মণ হারে। অন্যান্য জাতের পাটের ফলন তোষা জাতের পাটের চেয়ে অনেক কম। বর্তমানে তোষা জাতের ভালো মানের পাটের প্রতি মণ বাজার মূল্য ১৮শত থেকে ২হাজার টাকা। তবে বাজার মূল্য বিভিন্ন সময়ে কম বেশি হয় বলে পাট ব্যবসায়ীরা জানান।

এ ব্যাপারে কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ গোলাম সারওয়ার জানান, প্রকৃতপক্ষে পাট মূলত পাট সম্প্রসারন অধিদপ্তরের আওতায়। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে আমরাই কৃষকদের পাট সম্পর্কে যাবতীয় পরামর্শ দিয়ে আসছি। যদি সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে পাটের পণ্য ব্যবহার নিশ্চিত করে তাহলে কৃষকরা পাটের প্রকৃত মূল্য পাবেন এবং পাট চাষে আগ্রহী হবেন। বিগত বছরগুলোতে পাটের বাজার মন্দ থাকায় এই ফসলের প্রতি চাষিদের আগ্রহ কমেছে। বর্তমান সরকার খাদ্য দ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবেশ বান্ধব পাটের মোড়ক বহুবিদ ব্যবহার করায় বর্তমান পাটের উৎপাদন ও বাজার দর ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করায় এবার প্রান্তিক পর্যায়ে চাষিদেরও পাট চাষের আগ্রহ বৃদ্ধির লক্ষে চলতি খড়িপ মৌসুমে চাষীদের রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে কৃষকদের গঠনমূলক পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।