Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রাণীনগরে শিক্ষক নিয়োগের লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা কমিটিতে দ্বন্দ্ব, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা


আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি : নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার একডালা ইউনিয়নের গুয়াতা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারি প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের প্রায় ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ওই বিদ্যালয়ের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে। এই অবৈধ ভাবে নিয়োগে কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করা নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের মাঝে। যার কারনে বিদ্যালয়টির সার্বিক অবস্থা এখন খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে।

এতে করে ওই বিদ্যালয়ে পাঠদানের সুষ্ঠ পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা। দীর্ঘদিনের এই দ্বন্দ্বের কারণে ভেঙ্গে পড়েছে বিদ্যালয়ের সুষ্ঠ পাঠদানের পরিবেশ। সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতা ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রদান করা হয়েছে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর। ব্যবস্থাপনা কমিটির কিছু সদস্যকে ভয়ভীতি প্রদান করার অভিযোগও উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা, উপজেলার গুয়াতা উচ্চ বিদ্যালয় একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠ। এটি ১৯৬৭ সালে স্থাপতি হয়। সরকারি শর্ত অনুসারে প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৩৫-৪০জন সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থীর জন্য একজন কাব্যতীর্থ শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করার নিয়ম আছে। কিন্তু সেই সময় এই বিদ্যালয়ে ৩-৪জন শিক্ষার্থীর জন্য অর্থের বিনিময়ে কাব্যতীর্থ শিক্ষক হিসাবে ২০০২ সালে নিয়োগ প্রদান করা হয় বসুদেব কুমার পালকে।

পরবর্তিতে এই শিক্ষক গত ২১-১১-১৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রভাবশালী সভাপতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক হিসাবে পদন্নোতি গ্রহণ করেন। এই অর্থ সভাপতি প্রতিষ্ঠানে না দিয়ে একক ভাবে আত্মসাত করার কারণে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের মাঝে। শুধু অর্থই নয় সভাপতি সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে একক ভাবে বসুদেবকে প্রধান শিক্ষক হিসাবে এবং অন্য একজনকে সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ প্রদান করা এই দ্বন্দ্বের আরেকটি অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানে প্রদানের নাম করে সহকারি প্রধান শিক্ষকের নিকট থেকে নেওয়া হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা যা অন্যান্য সদস্যরা ও অভিভাবকসহ বিদ্যালয়ের অন্য কেউই জানেন না। এরপর থেকে শুরু হয় বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের মাঝে দ্বন্দ্ব। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মো: সামছুল হক, এসএম সামছুল হক, জাহাঙ্গির আলম ও বাবলু সরদার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতা ও শিক্ষক নিয়োগের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ প্রদান করেন।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ গত জুলাই মাসের ১২ তারিখে তদন্ত করেন। এতে ব্যাপক ভাবে সমস্যায় পড়ে যান দুই প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি। আর এই বিষয়টি রফাদফা করার জন্যই তদন্ত ফলাফল প্রকাশিত না হতেই গত ১৯শে জুলাই সভাপতি প্রধান শিক্ষক, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির কিছু সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ঘরোয়া বৈঠক করেন। বৈঠকে বিষয়টি সমাধান না হওয়ায় গত শুক্রবার আবার তারা বৈঠকে বসেন। ব্যবস্থাপনা কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সুপারিশ ব্যতিত এই দুই শিক্ষকের বেতন-ভাতা আটকে রয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই সভাপতি ঘরোয়া এই বৈঠকের আয়োজন করেন। বৈঠকে সদস্য, অভিভাবক ও গ্রামের গন্যমান্য ব্যক্তিরা সভাপতিকে শর্ত আরোপ করে বলেন আমাদের না জানিয়ে নিয়োগ বিষয়ে যে অর্থের লেনদেন করা হয়েছে তা সম্পন্ন ভাবে বিদ্যালয়ের ফান্ডে প্রদাণ করতে হবে এবং তাকে অচিরেই সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অভিযোগপত্র তুলে নেওয়ার জন্য সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের ম্যানেজ করার জন্য দফায় দফায় বৈঠক করেন এবং বৈঠকে পুনরায় আরো কিছু অর্থের লেনদেন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই ঘটনায় বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন যাবত ব্যাহত হচ্ছে সুষ্ঠ ভাবে পাঠদান। এই দ্বন্দ্বের কারণে চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এতে করে ওই এলাকার অভিভাবক ও স্থানীয়রা চরম উদ্বেগ ও ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। অচিরেই তারা বিষয়টির আশু সমাধান কামনা করেছেন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বসুদেব কুমার পাল জানান, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে মন-মালিন্ন্যের সৃষ্টি হওয়ায় তারা বৈঠক করে তা নিরসনের চেষ্টা করেন। আমার কোন বিষয় এরমধ্যে জড়িত ছিলো না।

ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এসএম সামছুল হক জানান, ওই দিন আমি বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম না। তবে বিষয়টি নিয়ে বসার জন্য আমরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে বৈঠক করা হয়েছে। আপনি সেখানে গেলে সব কিছু জানতে পারবেন।

ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম শিশির জানান, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের মাঝে বিভিন্ন কারণে অসন্তোষের সৃষ্টি হওয়ায় আমরা বিদ্যালয়ে ঘরোয়া ভাবে বৈঠক করে তা নিরসনের চেষ্টা করি।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো: রেজাইল ইসলাম জানান, সমস্যাটি অনেক আগের। আমি ওই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। এই চলমান দ্বন্দ্বের কারণে বিদ্যালয়টি শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই চেষ্টা করেছি বৈঠক করে সমস্যাটি দ্রুত নিরসন করার জন্য। স্থানীয় সংসদ সদস্য আশ্বাস দিয়েছেন তিনি নিজে এই সমস্যাটি সমাধান করবেন। তাই আমরা সেই অপেক্ষায় রয়েছি।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও আতাইকুলা জনকল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: জালাল উদ্দিন জানান, বসুদেবের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগটি সম্পন্ন ভাবে অবৈধ। কারণ ওই বিদ্যালয়ে সরকারি বিধান অনুসারে কখনোই ৪০জন সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থী ছিল না। তাই বসুদেব শিক্ষক হিসাবেই অবৈধ সে আবার প্রধান শিক্ষক হয় কিভাবে? অচিরেই কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি সুষ্ঠ তদন্ত সাপেক্ষে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তা না হলে এই সমস্যার কারণে চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বিষয়টি আমার আওতার বাহিরে। তারা আমার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ প্রদান করেছেন। তারাই বিষয়টি সম্পর্কে ভালো বলতে পারবেন।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: মোসলেম উদ্দিন জানান, আমি অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করেছি। তদন্ত ফলাফল রাজশাহী বিভাগীয় কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করেছি। তিনি তদন্ত ফলাফলের উপড় ভিত্তি করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

নওগাঁ।
মোবা: ০১৭২৯-৩২০০১১
তাং ২৪-০৭-১৭