Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রাণীনগরে বর্ষা মৌসুমে খাল-বিলে পানি কম থাকায় কর্মহীন মৎস্যজীবিরা


মো: শহিদুল ইসলাম, রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: নওগাঁর রাণীনগরে ভরা বর্ষা মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিলে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি না থাকায় স্থানীয় মৎস্যজীবিরা কর্মহীন অবস্থায় দিন কাটাছে। বর্তমানে সারা দিন খাল-বিলে জাল দিয়ে মাছ ধরে যা আয় হচ্ছে তা দিয়ে নিজের শ্রমের মূল্যই হচ্ছে না। তাই তারা পরিবার পরিজন নিয়ে নানান কষ্টে র্দূদিনে জীবন কাটাচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই আবার পেটের তাগিদে পৈতিক পেশা ছেড়ে বিভিন্ন ধরণের মিল, কল-কারখানা ও চাতালে কাজ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। অনেক কষ্ট করে খাল-বিলে মাছ ধরার জন্য বেশকিছু মৎস্যজীবিরা প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে ডিঙ্গি নৌকা, জাল, বাঁশ সহ অন্যান্য উপকরণ প্রস্তুত করলেও খাল-বিলে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি না থাকায় তা বন্ধ করে রেখে অলস সময় পাড় করছে। বেশকিছু মৎস্যজীবিরা এনজিও থেকে ঋন নিয়ে মাছ ধরার উপকরণ তৈরি করায় ঋনের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। খাল-বিলে পানি কম থাকায় মৎস্যজীবিরা আশানুরুপ দেশী প্রজাতির মাছ ধরতে না পাড়ায় বাজারে এখন দেশী মাছের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষ হাটে-বাজারে গিয়ে দেশী মাছ না পেয়ে কিছুটা বাধ্য হয়েই পুকুরের চাষকৃত মাছ কিনছে। বর্তমানে মাছের বাজারেও দেখা দিয়েছে মন্দা ভাব। সব মিলিয়ে এই পেশার সাথে জরিতরা র্দূদিনে জীবন-যাপন করছে।
নওগাঁ জেলা থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিনে খাল-বিল, নদী বেষ্টিত উপজেলা রাণীনগর। এই উপজেলার পশ্চিমে কাশিমপুর, মিরাট ও গোনা ইউনিয়নের কোল ঘেঁষে প্রবাহিত হয়েছে নওগাঁর ছোট যমুনা নদী। মিরাট ইউনিয়নে রয়েছে উন্মুক্ত জলাশয় বিল চৌর ও বিল মুনছুর। বর্তমানে তীব্র তাবদাহে পানি কম থাকায় ধরা পড়ছে না দেশীয় জাতের মাছ। বুধবার উপজেলার সদর, মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা, ধনপাড়া, মিরাট, বৈঠাখালি, ও গোনা ইউনিয়নের ঘোষগ্রাম, পিরেরা, বেতগাড়ী, দুর্গাপুর ও কাশিমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মৎস্যজীবিরা মাছ সংকটের কারণে হাতে তেমন কাজ না থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অথচ এই সময় মৎস্যজীবিরা নদী, নালা, খাল, বিলে জাল দিয়ে মাছ ধরে প্রতিদিন ৫শ’ থেকে ৯শ’ টাকা পর্যন্ত আয় করার কথা থাকলেও মাছের আকালের কারণে উপযুক্ত শ্রম দিয়েও আশানুরুপ মাছ না পেয়ে অভাব অনটনের কারণে পরিবারের সদস্যদের ডাল ভাত যোগাতে তারা মহাজনের ঋনের বেড়া জালে পড়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, আবহাওয় পরিবর্তনের কারণে ভরা বর্ষা মৌসুমে দিনের বেলা তীব্র রোদের কারণে পানি কম থাকায় দেশী প্রজাতির মাছ কমে গেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় বিল ও নদী-নালা ভরাট করে বসতবাড়ি এবং আবাদি জমি তৈরির কারণে নদ-নদী খাল বিলে দেশীয় প্রজাতির মাছ যেমন- পুঁটি, টেংড়া, গচি, চিংড়ি, শাটি, মলা, ঢেলা, চান্দা, বোয়াল, পাতাশি, রাইকর, স্বরপুঁটি, কই, শিং, মাগুড়, বোয়ালসহ বিভিন্ন জাতের দেশী মাছের আমদানি একেবারেই কমে গেছে। অল্প কিছু মাছ আমদানি হলেও তা আবার চলে যায় বৃত্তবানদের হাতে। সাধারণ মানুষের কপালে আর জোটেনা দেশী প্রজাতির সু-স্বাদু এই মাছগুলো।
জানা গেছে, উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭৭৮ জন লোক বসবাস করে। এর মধ্যে মৎস্যজীবির সংখ্যা ৩ হাজার ৭শ’ জন, রেজিষ্টার ধারী মৎস্যজীবির সংখ্যা এক হাজার একশত ২৮ জন। মৎস্য চাষীর সংখ্যা ৪ হাজার ৭শ’ জন। মৎস্যজীবি সমিতির সংখ্যা ৬০ টি। রাণীনগরে বার্ষিক মাছের চাহিদা ৩ হাজার ৯৯১ মেট্রিকটন। পুকুর ও দীঘির সংখ্যা ৪ শ’ ৮৪টি, মৌসুমী জলাশয়ের সংখ্যা ৩ শ’ ১০টি, নদীর সংখ্যা ৫টি, বিলের সংখ্যা ৬টি, প্লাবন ভূমির সংখ্যা ১৬টি, বানিজ্যিক মৎস্য খামারের সংখ্যা ৩১টি, মৎস্য অভয়াশ্রম ১টিসহ বিভিন্ন ধরণের জলাশয়ে মৎস্যজীবিরা মাছ ধরে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে।
উপজেলার কাশিমপুরের হালদার পাড়া গ্রামের নয়ন হালদার জানান, প্রতি বছরের তুলনায় এবছর নদ-নদী, খাল-বিলে পানি কম থাকায় দেশীয় প্রজাতির মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। সারা দিন জাল টেনে পেটের ভাতই জোগার করতে পারিনা। পরিবার চালাবো কি দিয়ে? তাই জাল নৌকা বন্ধ রেখে চাতালে কাজ করছি।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মাকছুদুর রহমান জানান, বর্তমানে এই এলাকায় বৃষ্টিপাত কম, জলাশয়গুলো ভরাট, জমিতে অতি মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগসহ নানান কারণে উম্মুক্ত জলাশয়ে জন্ম নেওয়া দেশী প্রজাতির মাছ গুলো কমে যাচ্ছে। তারপরও আশার বাণী এই যে, লাগাতার বৃষ্টি হলে উপজেলার নদ-নদী, খাল-বিল ভরে গেলেই মা মাছ গুলো ডিম ছাড়া শুরু করলে দেশী মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে মৎস্যজীবিরাও খালে-বিলে মাছ পাবে।