Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বদলগাছীর সঙ্গীত পাগল আরজ আলীর জীবন কাহিনী

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
এক্সক্লুসিভ, নওগাঁ, বিনোদন
No Comment

এমদাদুল হক দুলু, বদলগাছী (নওগাঁ): বিখ্যাত মরমী সাধক শাহ আব্দুল করিম রচিত “ গান গাই আমার মনরে বুঝাই,মন থাকে পাগল পাড়া, আর কিছু চাই না মনে গান ছাড়া ” তেমনি মরমী সাধক শাহ আব্দুল করিম এর গান কে মনের মাঝে লালন করে আজীবন গান গেয়ে এলাকার মানুষকে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছেন উপজেলা সদর সংলগ্ন আধাইপুর ইউনিয়নের সেনপাড়া গ্রামের আরজ আলী।
ছোট বেলা থেকেই গান ছাড়া কিছুই বুঝেন না তিনি। প্রায় ৫০ উর্দ্ধে গান পাগল এই মানুষটি গান কে সঙ্গী করে জীবনের শেষ সময়েও তিনি গানকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান। কিন্তু সারাজীবন গানকে ভালবেসে ও মানুষকে আনন্দ দিয়ে তিনি তাঁর জীবনে কিছুই পান নাই। এমন কি তার গান শুনার জন্য উপজেলা সদর সহ বিভিন্ন স্থানে তাঁকে ডেকে নিয়ে গেলেও কোন দিন তিনি কোন নায্য মুল্য পায়নি। তবুুুও তার কোন অভিযোগ নেই। তার গান শুনে মানুষ তাকে মনে রাখে এটাই তার পরম পাওয়া বলে মনে করেন তিনি।
হঠাৎ করে গান পাগল এই মানুষটি বদলগাছী চৌ-রাস্তার মোড়ে অবস্থিত মশিউর মার্কেটে প্রিন্স টেইলার্সে বসে সন্ধ্যার পর কয়েকজন শ্রোতাকে দু-তারা বাজিয়ে গান শুনাচ্ছেন এই অবস্থায় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। কিছুক্ষণ আলাপচারিতার মাঝে সময় কাটে তার সঙ্গে।
আরজ আলী গানের জগতে জীবনের পুরুটা সময় কি ভাবে অতিবাহিত করছেন অত্যন্ত দুঃখ ভরা ক্রান্ত মনে তার গল্প শুনান। তিনি বলেন ছোট থেকে তার গানের হাতে করি হয়েছে তার বাবা মৃত সাবুদ আলীর কাছে। তিনি ও গান করতেন। তাই বাবার হাত ধরেই তার এই দীর্ঘ পথ চলা। কিন্তু সারা জীবন গানকে ভালবেসে তিনি তাঁর জীবনে কিছুই পাননি। পেয়েছেন শুধু সাধারণ মানুষের ভালবাসা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন আজ থেকে প্রায় ২০/২২ বৎসর পূর্বে রাজশাহী বেতারে দু-দুবার গানের অডিশন দিয়েছিলেন তিনি ,কিন্তু কোন সুযোগ হয়নি। তার ইচ্ছে ছিল এই প্রতিভাকে বিকশিত করে বাংলার মানুষকে গান শুনানোর। আর এই গানের মাঝেই বেঁচে থাকার ইচ্ছে ছিলো তাঁর। কিন্তু বিধাতা তার উপর সুপ্রশন্ন হলে ও সুপ্রশন্ন হয়নি বেতারের কর্তা ব্যাক্তিরা। অডিশনে বেতার কর্তাদের গান শুনিয়ে খুশি করলেও দরিদ্র আরজ আলী অর্থ খরচ করতে না পারায় বার বার নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছেন। তার পর তিনি আর মনের দুঃখে সেখানে কোন অডিশন দিতে যান নাই। তিনি জানান, তার স্ব-রচিত আধ্যাতিœক, পল্লীগীতি ও দেশাত্ববোধক সহ প্রায় শতাধিক গান রয়েছেন। উপজেলা সদর সহ নওগাঁ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তিনি গানের অনুষ্টানে যোগদানের জন্য অনুরোধ পেয়ে থাকেন এবং উক্ত অনুষ্টান গুলিতে উপস্থিত হয়ে নিজের স্ব-রচিত গানের পাশাপাশি মরমী শিল্পী আব্দুল আলিম এর গাওয়া পল্লীগীতি গান শুনিয়ে প্রচুর প্রসংশিত হয়েছেন । কিন্তু তিনি সরকারী ভাবে বেতার বা টেলিভিশনে গান পরিবেশন সহ গীতিকারের তালিকা ভুক্ত না হতে পেরে মনের মাঝে পাহাড় সমান কষ্ট নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। তার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে বদলগাছী মহিলা কলেজের তৎকালিন ম্যানেজিং কমিটি তাকে একটি নৈশ্য প্রহরীর চাকুরীও দিয়েছেন। ওই চাকুরীর পাশা পাশি উপজেলা সদরের ব্যবসায়ীরা তাকে গানের অনুরোধ করলে তিনি তার দু-তারা বাজিয়ে দোকান ঘরে মধ্যে বা দোকানের বাহিরে বসে গান শুনিয়ে থাকেন তাঁদের। তার গান শুনে খুশি হয়ে ব্যবসায়ীরা তাকে সম্মাননা স্বরুপ যদি কিছু অর্থ দিয়ে থাকেন তাহলে সে সাদরে গ্রহন করেন।
উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী প্রিন্স টেইলাসের মালিক নুরুজ্জামান বাবু , সঙ্গীত প্রিয় সাবেক সেনা সদস্য আনিছুর রহমান শ্রাবন সহ কয়েক জন ব্যাক্তি সদা হাস্যউজ্জল গান পাগল এই মানুষটির সর্ম্পকে বলেন, তাকে ডেকে গান শুনে কেউ কোন সম্মানী স্বরুপ কোন প্রকার অর্থ না দিলেও তার কোন অভিযোগ থাকে না। তাকে ডেকে তার গান শুনেছেন এইটাতেই সে বেশ খুশি হয়ে থাকেন। এ ভাবেই তার জীবনের ৫০ বৎসর অতিবাহিত করেছেন। তার সংসারে তার সহ ধর্মীনি একমাত্র স্ত্রী জাহানারা বেগম ছাড়া তাদের ঘরে কোন নিজ সন্তান নেই। তবে তার বড় ভাই ইসমাইলের ২ ছেলে ও ২ মেয়ে কে রেখে মারা গেলে আরজ আলী বড় ভাইয়ের ৪ সন্তানকে লালন পালন করেন। তাদের নিজ সন্তানের মত লালন পালন করে ২ ছেলেকে বিয়ে সাধি দিয়েছেন এবং ২ মেয়ে ইসমত আরা মুনি ও ফেনসি আক্তার তাদের কেও বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। এখন তার জীবনের সাথে জড়িয়ে রয়েছে তার স্ত্রী এবং তার গান। কিন্তু তার স্ত্রী জাহানারা বেগম গত প্রায় ৬ মাস যাবৎ ব্রেইন ষ্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তার ঔষুধ সংগ্রহ করা তার জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তিনি বদলগাছী মহিলা ডিগ্রী কলেজে নৈশ্য প্রহরীর চাকুরী করে যা বেতন পেয়ে থাকেন তা দিয়ে স্ত্রীর ঔষুধ কিনতেই ব্যয় হয়ে যায়। সুখ দুঃখের মাঝেই চলছে তার সঙ্গীতের আনন্দ। তার ভাষায় “গান আমার জীবনরে ভাই গান আমার প্রান”। তিনি দুঃখের সুরে জানান এই উপজেলার যারা বাউল শিল্পী নন তারাও সরকারের কাছ থেকে বাউল ভাতা পায় কিন্তু আমার ভাগ্যে জোটেনি। তাতেও তার কোন আক্ষেপ নেই। গান পাগল আরজ আলীর ইচ্ছে জীবনের শেষ সময় হলে ও তার স্ব-রচিত গান গুলি যদি কোন সঙ্গীত প্রতিষ্টান, রেডিও বেতার , বে-সরকারী টিভি চ্যানেল পৃষ্ট পোষকতার মাধ্যমে প্রচারে এগিয়ে আসেন তাহলে তিনি গানের মাধ্যমে বেঁচে থাকতেন এটা তার প্রত্যশা।