Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বদলগাছীর প্রচার বিমুখ সাদা মনের মানুষ রজত গোস্বামী

মার্চ ১৩, ২০১৭
নওগাঁ, বিবিধ
No Comment


নওগাঁ থেকে আব্দুর রউফ রিপন: সমাজের প্রতি মানুষের ভালবাসা পরস্পর নির্ভরশীলতা, সহযোগিতা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। আদিকাল থেকেই এমন ভাবে চলে আসছে। সমাজে এখনো অনেক ভাল মানুষ আছে। যারা ভাল কাজের মধ্য দিয়ে সমাজে ভাল কিছু উপহার দেয়ার মানসিকতা নিয়ে নিরবে কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের অর্থ কিংবা বিত্ত-বৈভব না থাকলেও মানবিক মন থাকলে মানুষের সেবা করা যায়। ভাল কাজের জন্য থাকতে হয় সদিচ্ছা ও মন মানসিকতা। যারা মানুষের ভাগ্য বদলে কাজ করেন নিজেদের আত্মতৃপ্তির জন্য। তাদের মধ্যে একজন প্রচার বিমুখ ব্যাক্তি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার রজত গোস্বামী। যিনি প্রায় এক যুগের অধিক সময় ধরে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানো সহ শিক্ষিত জাতি গড়ার লক্ষ্যে শিক্ষার উন্নয়নে যাবতীয় কাজ করে যাচ্ছে ।

শুধু মাত্র মানসিক প্রশান্তি ও এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী করতে ২০০৪ সালে ‘বিদ্যাসাগর ইন্সটিটিউট’ নাম দিয়ে স্কুল পর্যাদের ছাত্র ছাত্রীদের বিনামূল্যে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করার মধ্য দিয়ে এ সেবামূলক কাজের যাত্রা শুরু করেন তিনি। জাতী ধর্ম বর্ণ নীর্মিশেষে প্রায় এক যুগের অধিক সময় ধরে এলাকার নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়ন বিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদান করে আসছেন। মূল উদ্দেশ্য শিক্ষায় ঝড়ে পড়া রোধ ,শির্ক্ষাথীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহি করা ও শিক্ষিত জাতি গড়া। শিক্ষার্থীদের মেধাশক্তি বাড়াতে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাধারন জ্ঞানসহ আন্তর্জাতিক সম্পকের্ও ধারনা দেন তিনি। আর শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ থেকে পড়তে আসেন।
এ লক্ষ্যে তিনি সফলও হয়েছেন । ইতিমধ্যে তার কয়েক জন ছাত্র এম বি বি এস পাশ করে কর্মজীবনে লেগেছে এবং কয়েক জন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংও শেষ করেছেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে অধ্যয়নরত আছে বেশ কয়েক জন ।

শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সুবিধার জন্য থানার সামনে উপজেলা সাধারন গ্রন্থাগারের দ্বিতীয় তলায় দুটি ঘরের ব্যবস্থা করে নিয়েছেন গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। প্রতিদিন বিকেল থেকে সেখানে শিফট ভাবে নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। আর প্রতিটি শিফটে রয়েছে ১৫/২০ জন শিক্ষার্থী। এ পর্যন্তÍ ১১টি ব্যাচ ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা তাঁকে স্যার বলে সম্বোধন না করলেও সবাই কাকু বলে সম্বোধন করে এই গুণীব্যাক্তিকে।

শুধু বিনামূলে প্রাইভেটই পড়ান না তিনি, পাশাপাশি যে সকল শির্ক্ষাথী অর্থের অভাবে পড়াশুনা করতে পারেন না তাদের নিজ উদ্যোগে ‘বিদ্যাসাগর ইন্সটিটিউট’এর পক্ষ হতে কাগজ-কলমসহ শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগীতা করেন । দরিদ্র ছাত্রদের ভর্তি ,ফরম ফিলাপ,বই কেনা সহ বিভিন্ন ভাবে আর্থিক সহযোগিতাও করছে স্বার্থহীন ভাবে ।

সমাজসেবায় গুণী এ ব্যক্তি ছোট থেকেই ছিলেন অদম্য মেধাসম্পন্ন। বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনায় এসএসসি ১৯৮৫, এইচএসসি ১৯৮৭ এবং ডিগ্রী ১৯৯০ সালে সম্পন্ন করেন। ডিগ্রী পড়াশুনা অবস্থায় বদলগাছী সমাজসেবা অফিসে ইউনিয়ন সমাজকর্মী হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেন। বদলগাছী সদরের বাসিন্দা তিনি । জীবিকার তাগিদে চাকরির পাশাপাশি এভাবেই করে আসছে নানা বিধ সমাজ উন্নয়ন কাজ ।

বিনামূল্যে প্রাইভেট পড়ানো ছাড়াও ক্রীড়ার সাথে সম্পৃক্ত এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় মেয়েদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘মহিলা হ্যান্ডবল টিম’। এ টিমে ২০জন সব বয়সের খেলোয়ার আছে। এ টিমটি ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি জাতীয় পুরুস্কার অর্জন করেছে । টিমের ৩জন খেলোয়ার সাহিদা বানু রনি, পূর্নিমা রাণী ও শাহনাজ পারভীন জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে খেলছেন । এছাড়া ৫জনের মধ্যে দুইজন পুলিশে, দুইজন বিজেএমসি এবং একজন আনছার বাহিনীতে চাকুরি করছেন।

এছাড়াও প্রতি বছর কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধণা, গরিব অসহায়দের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, প্রতিবন্ধীদের হুইল চেয়ার বিতরণ, দরিদ্রদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদানসহ বেশ কিছু কাজ নিরবে করে যাচ্ছেন তিনি ।

ছাত্রী রুবাইয়া তাবাসসুম ওই প্রতিষ্ঠানে পড়ে ২০১০ সালে এসএসসি পাশ করে গোপালগঞ্জে চিকিৎসা বিষয়ে পড়াশুনা করছেন। তিনি বলেন, কাকু এতো সুন্দর করে বিষয়গুলো বুঝাতেন যা বই পড়ে বুঝা সম্ভব নয়। পড়ার মাঝে ছোট ছোট ভুলগুলো ধরিয়ে সংশোধন করে দিতেন। আর তিনি যে ধরনের প্রশ্নগুলো করতেন তা ছিল ভিন্ন আঙ্গিক। স্কুলের শিক্ষককে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করতে ভয় লাগতো। কিন্তু কাকুকে প্রশ্ন করতে ভয় লাগতো না। মূলত তার কাছ থেকে প্রশ্ন বলতে শিখা।

ছাত্র ফয়সাল হাসান ২০০৯ সালে এসএসসি পাশ করে ঢাকায় এমএসসির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, এই এলাকায় তখন পদার্থ ও রসায়ন পড়ানোর মতো তেমন শিক্ষক ছিলনা। খুটিনাটি বিষয়গুলো ভাল করে বুঝাতেন। বন্ধুত্ব সুলভ আচরণ করতেন। ঈদ ও পূজোয় আমরা বিগত সকল শিক্ষার্থী মিলে পিকনিক করে আনন্দ উল্লাস করতাম।

এছাড়া শিক্ষার্থী সুমন হোসেন, নাসির উদ্দিন, আবু সাঈদ, আল মাহমুদ হাদি, সত্যব্রত সরকার, চঞ্চল কুমার, সাথী, সোনিয়ার সাথে কথা বলে জানা যায়, এখানে ধনী-গরীব বলে কোন ভেদাভেদ নেই। আমরা যারা এখানে পড়ি তাদের কাউকে টাকা দিতে হয়না। মাস শেষে টাকা দিতে চাইলে কাকু পরদিন আসতে নিষেধ করে দেন। কোথাও প্রাইভেট পড়লে শুধু সে বিষয়ে ধারনা পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে পাঠ্যপুস্তুকের পাশাপাশি জাতীয়, আন্তর্জাতিক, সাধারন জ্ঞানসহ সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়।

সমাজসেবী রজত গোস্বামী বলেন, সমাজের উন্নয়নমূলক কাজগুলো করতে প্রথমত বাবার (মৃত প্রণীব কান্ত গোস্বামী উদয়) কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছি। আর সেখান থেকেই সমাজ সেবার হাতেখড়ি। পরবর্তীতে নিজ উদ্যোগেই কাজ করে যাচ্ছি । কাজগুলো করতে পারলে মনে একটা তৃপ্তি পাই তাই করি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলতে, ‘বিদ্যাসাগর ইন্সটিটিউটটি’ বহুমূখী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা। প্রতিষ্ঠানটি টিকে রাখতে সকলের সহযোগীতা কামনা করছি।

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হুসাইন শওকত বলেন, রজত গোস্বামীর কাজগুলো সত্যিই প্রশংসনীয় । তিনি নি:সন্দেহে একজন ভাল মনের মানুষ । তাঁর কাজগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য আমাদের প্রত্যেকের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।