Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

পীরগঞ্জে ভয়াবহ বন্যা, লাশ দাফনের জায়গাও নেই!


বখতিয়ার রহমান, পীরগঞ্জ (রংপুর) : বাবা, কয়দিন ধরি হামরা পানির কারাগারোত বন্দী হয়া আছি। কেউ হামাক দ্যাখপ্যাও আইসেনা, খাবারও পাইনা। এই বুড়া বয়সে দিনে রাতে ১ বার খায়া কি থাকা যায় ? প্যাটের কষ্ট কি সহ্য করা যায়? চারিদিকে পানি আর পানি। ককন যে পানিত পড়ি মরি যাও বাবা। তোরা এ্যানা বাঁচাও বাবা।
অসহায় আর কান্নাজড়িত ক্ষীণ কন্ঠে কথা গুলো বলেন, শতবর্ষী সুকী মাই বেওয়া। তার বাড়ী বন্যা কবলিত চতরা ইউনিয়নের সোনাতলায়। তার বাড়ীর চতুর্পাশে গলা পরিমান বন্যার পানি। তারা বাড়ীর টীনের চালার উপরে অস্থায়ী ভাবে বসত করছে। তাদেও খাবার পাশাপাশি পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সুকী মাইয়ের মতো ইউনিয়নটির কাঁটাদুয়ার গ্রামের শতবর্ষী মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন, সোনাতলার (ঝাকাপাড়া) লাল মিয়া, কুয়েতপুর মাঝিপাড়ার গনেশ চৌধুরী, গৌর চন্দ্র এবং অবিনাশ, বদনারপাড়ার সাহেব আলী, কুয়েতপুরের জোহরা বেগম, নছিরামসহ হাজারো পানিবন্দি মানুষ খাবার না পেয়ে কাঁদছে। বন্যা শুরু থেকে ১২ দিনে কারো কাছে ৪/৫ কেজি চাল সরকারী সাহায্য একবার পৌছেছে। আবার কারো কাছে এখনো পৌঁছেনি।
গত শনিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার সর্ব দক্ষিণে চতরা ইউনিয়নটি করতোয়া নদীঘেষা। ইউনিয়নটির ২৪ টি মৌজার মধ্যে ১৯ টিতেই ৮ দিন ধরে বন্যার পানি ঢুকে আছে। কোথাও গলা পরিমান আবার কোথাও কোমর পর্যন্ত পানি। ধানসহ রবি শষ্যের ক্ষেত পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। টিউবওয়েলগুলোর কোনটা থেকেই খাবার পানি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। উচু কোন স্থানে গবাদিপশু রাখা হয়েছে। বানভাসিরা পানি আর খাবারের আশায় পথ চেয়ে আছে। তাদের কাছে দিনে রাতে মাত্র একবার খাবার পৌছে যাচ্ছে বলে বন্যার্তরা জানায়। ইউনিয়নটিতে ৬টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র থাকলেও বাড়ীঘর ছেড়ে কেউ সেখানে যাচ্ছে না। কেউ বাড়ীতে আছেন বা আত্মীয়ের বাড়ীতে গেছেন। চতরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে পানি বিশুদ্ধকরন ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন, শুকনো খাবার বিতরন করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে চতরা ইউপির চেয়ারম্যান এনামুল হক শাহীন প্রধান বলেন, আমরা ইউনিয়নের ২৪টি মৌজায় ৯ হাজার পরিবারের মধ্যে ১৯ মৌজার প্রায় ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। কুয়েতপুর এবং কুমারপুর গ্রাম সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কেউ নৌকা নিয়ে বন্যা এলাকায় গেলেই মানুষজন খাবারের জন্য গলা পানি ভেঙ্গে ছুটে আসছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ না নিয়ে যাওয়ায় অনেক সময় আমরা বুভুক্ষু মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে আসছি। তিনি আরও জানান, আমার ইউনিয়নের গৌরেশ্বরপুরে ২টি, কাঁঠালপাড়া, কাঙ্গুরপাড়া, যাদবপুর এবং অনন্তপুর গ্রামে ১টি করে মোট ৬টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র থাকলেও শুধু অনন্তপুর আশ্রয় কেন্দ্রে কয়েকটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যার্তরা এলে সাহায্য দিতে আমাদের কষ্ট কম হতো। তিনি আরও জানান, করতোয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের ম্যাছনার গড়, বদনারপাড়া ও কুয়েতপুর বিল নামকস্থানে ভেঙ্গে যাওয়ায় চতরা ইউনিয়নে পানি ঢুকেছে। ফলে উচু স্থান নেই। মানুষ মারা গেলে নিজ জমিতে কবর দেয়া সম্ভব হবে না।
এবারের বন্যায় করতোয়ার পানি উছলে এবং বাঁধ ভেঙ্গে টুকুরিয়া, চৈত্রকোল, বড়আলমপুর, চতরা ও কাবিলপুর ইউনিয়নের অসংখ্য গ্রাম পানিতে তলিয়ে আছে। গ্রামগুলো হচ্ছে- জলাইডাঙ্গা, বাসুদেবপুর, রামকানুপুর, ভাদুরিয়া, গোবিন্দপুর, খালিশা, চকভেকা, গ্রামতলা, কুয়েতপুর, হামিদপুর, কুমারপুর, বদনাপাড়া, ঘাসিপুর, কুলানন্দপুর, সোন্দলপুর, সুরানন্দপুর, কাটাদুয়ার, চন্ডিদুয়ার, নিশ্চিন্তবাটি, বাটিকামারী, জামদানী, শায়েস্তাপুর, বিছনা, দক্ষিন দুর্গাপুর, টিওরমারী, বোয়ালমারী, মেরীপাড়া, পারবোয়ালমারী, তরফমৌজা, সুজারকুঠি, জয়ন্তীপুর, গোপীনাথপুর, কাশিপুর, দুিধয়াবাড়ি, ছাতুয়া, কোমরসই, হরিনা, পার হরিনা, কোমরসই, আটিয়াবাড়ি, হরনাথপুর, মাধবপুর, গন্ধ্রর্বপুর, ধর্মদাশপুর, ওমরপুর, রামনাথপুর, বাঁশপুকুরিয়া, শিমুলবাড়ি, ফরিদপুর, গাংজোয়ার, হলদিবাড়ি, চকরাঙ্গামাটি, ইসলামপুর, জুনিদপুর, শেরপুর, জাহিদপুর, নীচকাবিলপুর, টুকনিপাড়াসহ দু’শ গ্রাম। কিন্তু পীরগঞ্জকে সরকার এখনো বন্যা দুর্গত এলাকা ঘোষণা করেনি ।
উজান থেকে নেমে আসা পানিতে পীরগঞ্জের করতোয়া নদীপাড়ের সহ উপজেলার ৩’শ ৩১টি গ্রামের মধ্যে প্রায় দু’শ গ্রাম বন্যা এবং জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে করতোয়া, আখিরা, যমুনেশ^রী ও নলেয়া নদী ঘেষাঁ ৯ ইউনয়নের ৮২ টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। গত ৩ দিনে পানিতে ডুবে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। চতরা ইউনিয়নের কাটাদুয়ার গ্রামের প্রফেসর আব্দুল হামিদ (৬৫) গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কলাগাছের ভেলায় চড়ে যাওয়ার সময় পানিতে ডুবে মারা যায়। টুকুরিয়া ইউনিয়নের গোপীনাথপুরের আব্দুল লতিব (৪৫), সুজারকুঠি গ্রামের সুজন নামের এক শিশু গত শুক্রবার বিকেলে পনিতে ডুবে মারা গেছে। তাকে তার চাচার জমিতে কবর দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন, বন্যা এলাকার ইউনিয়নের বানভাসীরা তল্পিতল্পাসহ অপেক্ষাকৃত উচু এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। যাদের আশ্রয় নেয়ার কোন জায়গা নেই তারা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও গৃহপালিত পশু সহ আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের ঠাঁই করে নিয়েছে। কোন কোন এলাকার লোকজন রান্না করবার কোন প্রকার জায়গা না থাকা সত্ত্বেও বাড়িতেই পড়ে রয়েছে।
উপজেলা ত্রান ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, বন্যায় এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৫২৫ টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমল কুমার ঘোষ জানান, টুকুরিয়া ইউনিয়নে ৫ মে. টন, চতরায় ৪ মে. টন এবং কাবিলপুরে ৩ মে. টনসহ বন্যার্তদের জন্য সরকারীভাবে ২০ মে. টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরকারী সাহায্য আরও বাড়ানোর জন্য ইউপি চেয়ারম্যানরা জোর দাবী জানিয়েছে।