Pages

Categories

Search

আজ- বৃহস্পতিবার ২২ নভেম্বর ২০১৮

পীরগঞ্জের হযরত শাহ ঈসমাইল গাজী (রহঃ) এর স্মৃতি বিজরিত মাজার শরীফ অবহেলিত

সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৬
ফিচার, রংপুর
No Comment

nildoria_photo_51
বখতিয়ার রহমান, পীরগঞ্জ ( রংপুর): অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে পীরগঞ্জের হযরত শাহ ঈসমাইল গাজী (রহঃ) এর স্মৃতি বিজরিত মাজার শরীফটি । কথিত আছে এখানেই শায়িত আছেন উপমহাদেশের ইসলামী ধর্ম যাজক শাহ ঈসমাইল গাজী (রহঃ) । আর তাঁর কবরস্থানকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে রংপুর- বগুড়া মহাসড়ক সংলগ্ন উপজেলার বড়দরগাহতে এ মাজার শরীফটি । তবে সে মাজার শরিফটি আজ চরম অবহেলীত । এ মাজারটির পরিচিতির জন্য যে সাইন বোর্ড ছিল সেটিও এখন আর নেই । ফলে আজও দুর দুরান্তরের পথিকদের কাছে অজানাই থাকছে মাজার শরীফটি । সে সঙ্গে সংস্কারের অভাবে অনেকটাই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে মাজার শরীফটি । আর যা অনেক ধর্মপ্রান ব্যাক্তিদের কাছে বেদনার কারন হয়ে দাড়িয়েছে ।

কথিত আছে, প্রাচীনকালে রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় অনেক পীর আউলিয়ার আগমন ঘটেছিল । আগমন ঘটেছিল অনেক রাজা বাদশারও । যারা রাজপ্রাসাদে বসবাসের মাধ্যমে এ এলাকা শাসন করতেন । প্রায় ১২ শ শতাব্দীতে বাংলায় যখন হিন্দু স¤প্রদায়ের প্রতাপ ছিল তখন পাক-ভারতের রাজধানী ছিল গৌড়ে । আর লক্ষনসেন ছিলেন গৌড়ের রাজা। তখন ছিল হিন্দুদের শাসন । গৌড়ের রাজা লক্ষনসেনের অধিন পীরগঞ্জে এমনি একজন রাজা ছিলেন তার নাম রাজা নীলা¤^র দেব। তার রাজধানী ছিল পীরগঞ্জের চতরায়। যার অবস্থান পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে চতরা বাজারের অনতিদুরে নীলদরিয়া নামক স্থানে ।
সে যুগে হিন্দু রাজা বাদশাহরা নিরীহ প্রজাদের উপর নানা ধরনের নির্যাতন চালাতো। তাদের অত্যাচারের মাত্রা এতই প্রখর ছিল যে রাজার হুকুম ছাড়া প্রজারা কন্যা পর্যন্ত পাত্রস্থ করতে পারতেন না। দিনের পর দিন যখন হিন্দু রাজাদের অত্যাচারের মাত্রা বেড়েই চলছে, তখনই ১৭ জন আউলিয়ার আগমন ঘটে পাক-ভারতে। এই আউলিয়াগণ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে ইসলাম ধর্মের কথা প্রচার করতে থাকেন। লোকজন তাদের সাথে সহজে মিশতে এবং কথা বলতে পারায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। জানা যায়, আউলিয়ার মধ্যে একজন ছিলেন শাহ ইসমাইল গাজী (রহঃ)। তিনি পীরগঞ্জের বড় দরগাহতে আস্তানা গড়ে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। এক সময় তিনি এখান থেকে কর আদায়ের জন্য চতরার রাজা নীলাম্বর দেবের কাছে লোক পাঠান । কিন্তু নীলাম্বর মুসলমানদের কর দিতে অস্বীকার করলে শাহ ঈসমাইল গাজী (রহঃ) রাজা নীলাম্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এ সংবাদ জানতে পেরে শত্রু পক্ষের হাত থেকে রক্ষার জন্য রাজা নীলাম্বর তার চতরাস্থ রাজধানীর চারপাশে আশি হাত প্রস্থ এবং আশি হাত গভীর ৫৬ একর জমিতে একটি পরিখা খনন করেন। খননকৃত ওই পরিখার মাটি দিয়ে রাজধানীর চারপার্শ্বে উঁচু করে ইটের প্রাচীর নির্মাণ করেন। প্রাচীরের দক্ষিণ দিকে রাখা হয় একটি মাত্র সদর দরজা। এই দরজা বন্ধ করা হলে রাজধানীর ভিতরে প্রবেশ করার কোন উপায় ছিল না। রাজধানী সুরক্ষার কাজ সমাপ্ত করে নীলাম্বরের সৈন্যরা রাজধানী থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দুরত্ব পর্যন্ত মাটি দিয়ে অসংখ্য বেড় (গড়) তৈরী করেন । সেই গড়ে হাতি পর্যন্ত লুকিয়ে থাকতে পারতো। এখনও কালের স্বাক্ষী হিসেবে গড়গুলো বিদ্যমান রয়েছে। সর্বশেষ গড়টি ছিল উপজেলা সদর থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে গাড়াবেড় পর্যন্ত। তখন থেকেই এ স্থানের নামকরণ করা হয় গাড়াবেড় মৌজার। নীলাম্বরের সৈন্যরাও এগিয়ে ছিল এই গাড়াবেড় পর্যন্ত। গড়গুলো তৈরী করা হয়েছিল শক্র পক্ষের হাত থেকে রাজধানী রক্ষা করা । যাতে এখানে লুকিয়ে থেকে শত্রু পক্ষের উপর আঘাত হানা যায়। পরবর্তিতে যুদ্ধ ঘোষনার এক পর্যায়ে শাহ ঈসমাইল গাজী (রহঃ) সৈন্য সহ গাড়াবের হয়ে চতরা অভিমুখে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। গাড়াবেড়ে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চলায় মুসলমান সৈন্যদের সাহস ও যুদ্ধের কৌশলের কারণে নীলাম্বরের সৈন্যরা পিছু হটে চতরাস্থ রাজধানীতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পিছুহটে রাজধানীতে আশ্রয় নেয়ার পর মুসলমান সৈন্যদের রাজধানীর অভিমুখে অগ্রসর হবার খবরে রাজা নীলা¤^র সমস্ত সৈন্য ও প্রচুর খাদ্য সামগ্রী নিয়ে রাজধানীর ভিতরে প্রাচীর বেষ্টিত সদর দরজা বন্ধ করে অবস্থান করেন। এদিকে মুসলমান সৈনিকরা রাজধানী ঘিরে ফেলেন এবং অবরোধ সৃষ্টি করেন। যাতে নীলাম্বরের কোন সৈন্য বাইরে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করতে না পারে। এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর নীলাম্বরের রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়। শুধু পানি পান করে সৈন্যরা দিন কাটাচ্ছিল। ফলে শারীরিক দিক থেকে সৈন্যরা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে মুসলমান সৈন্যরা রাজধানীর সদর দরজা ভেঙ্গে একযোগে রাজধানী আক্রমণ করে এবং একে একে সমস্ত শক্র সৈন্যকে হত্যা করে ও রাজা নীলাম্বর দেব কে বন্দি করে গৌড়ে পাঠিয়ে দেন। এরপর নীলাম্বরের কি পরিণতি হয়েছে ? আজও তা অজানা রহস্যই রয়ে গেছে।
তাই শাহ ঈসমাইল গাজী ( রহঃ) এর ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে এ বিরত্ব আজও পীরগঞ্জ বাসীর অনেক
প্রবীনের মাঝে আলোচীত হয় এবং এ মহান ইসলাম প্রচারকের সমাধীস্থল মাজার শরীফটি মুসলমানদের কাছে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে ।