Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ১৪ নভেম্বর ২০১৮

পলাশে মোগল আমলের স্মৃতিবাহী তিন গম্বুজ মসজিদ

narsingdipc[1]

নূরে-আলম রনী, নরসিংদী প্রতিনিধিঃ নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় রয়েছে মোগল আমলের মুসলিম সভ্যতার অনুপম নিদর্শন পারুলিয়ার তিন গম্বুজ মসজিদ। প্রায় ৪শত বছর আগের এই ঐতিহাসিক মসজিদটি আজো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর এই মসজিদটির পাশেই রয়েছে ইশাখাঁর পঞ্চম অধস্তন পুরুষ দেওয়ান শরিফ খাঁ ও তার স্ত্রী মুর্শিদ কুলি খাঁর কন্যা জয়নব বিবির যুগল মাজার। জানা যায়, ১৭১৯ হিজরিতে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি র্নিমাণ করেন জয়নব বিবি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭২২ পর্যন্ত নরসিংদী ঢাকা জেলার মহেশ্বরদী নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। সুবেদার নিযুক্ত হওয়ার পর তার কনিষ্ঠ কন্যা জয়নবকে ঈশাখাঁর পঞ্চম অধস্তন পুরুষ মনোয়ার খাঁর পঞ্চম ছেলে শরিফ খাঁর সাথে বিবাহ দিয়ে জামাতাকে মহেশ্বরদী পরগনার দেওয়ান নিযুক্ত করেন। তখন থেকেই তিনি দেওয়ান শরিফ খাঁ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এবং এলাকার নাম করণ করা হয় শরিফপুর। ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, হুসেন শাহীর শাসন আমলে ধনপদসিংহ নামে এক রাজা ছিল তার পুত্র রাজা নরসিংহ শীতলক্ষ্যার তিন মাইল আগে ব্রম্ক্ষপুত্রের তীরে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলেন এবং সেখানে তার নামে নামকরণ করেন নগর নরসিংহপুর। আজো নগর নরসিংহপুর বিদ্যমান। তবে কালের আবর্তে শরিফপুর নামের বিলুপ্ত ঘটে। তৎসময়ে বহ্মপুত্র নদ দিয়ে বড় বড় পাল উড়িয়ে পালের নৌকা আসা যাওয়া করত। পালের নৌকা দেখতে এলাকবাসী নদের তীরে যেত। তখন থেকেই এর নামকরণ করা হয় পারুলিয়া। ১৭১৯ হিজরীতে দেওয়ান শরিফ খাঁর স্ত্রী জয়নব বিবি এলাকার মানুষের চাহিদা মোতাবেক মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের আওতায় রয়েছে ১২ বিঘা জমি। এখানে রয়েছে চারটি শান বাঁধানো পুকুরঘাট। মসজিদটি ৫ ফুট প্রস্থ দেয়াল, তার মধ্যে মজবুত পাথর দিয়ে খিলানের উপর ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য মসজিদটি নির্মিত। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে একটি প্রধান গেইট, পূর্ব দিকে তিনটি দরজা, উত্তর-দক্ষিণে একটি করে দরজা। মসজিদের পাকা বেষ্টনী প্রাচীরের অভ্যান্তরে রয়েছে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণের উত্তর-পূর্ব কোণে রয়েছে সুউচ্চ দু’টি মিনার। মসজিদের কারুকাজ অত্যন্ত শিল্প সুষমামন্ডিত। জানা যায়, ইরান, বাগদাদ, ইয়েমেন দেশ থেকে কারিগর এনে মসজিদের নির্মাণ ও কারুকাজ করা হয়। মসজিদের সম্মুখভাগের ওপর একটি স্মৃতিফলকে লেখা আছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল লহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ কার্দে জয়নব বিনতে নাছের জজায়ে দেওয়ান শরিফ, হিজরি ১০২০ সাল। এ প্রাচীন ঐতিহাসিক মসজিদটি ৪’শ বছর আগে নির্মিত হলেও আজো আপন শিল্পকর্মে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পলাশ উপজেলার নিবিড় পল্লীতে শান্ত পরিবেশে মসজিদটি অবস্থিত। ১৯০৪ সালে প্রচন্ড ভূমিকম্পে মসজিদের ছাদে একটি ফাটল দেখা দেয়, আর ভূমিকম্পে ধবংশ হয়ে যায় দেওয়ান সাহেবের কাচারিঘর, নায়েব সাহেবের ভবনটি। মসজিদের পূর্ব কোণে কয়েকটি প্রাচীন কবরের ধবংশাবশেষ। মসজিদের বারান্দায় প্রবেশ দরজায় উপরিভাগে ফার্সি ভাষায় লেখা আছে মসজিদ তৈরির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। পাঠোদ্ধারে জানা যায়, ১১২৮ হিজরিতে নাছেরের কন্যা দেওয়ান শরিফের স্ত্রী জয়নব বিবি মসজিদটি তৈরি করেন। মসজিদের পশ্চিম পাশে পুকুরের পূর্ব তীরে এক গম্বুজবিশিষ্ট সৌধ। পাশাপাশি দু’টি কবর। জানা যায়, ১১২৮ হিজরীতে দেওয়ান শরিফ খাঁ ইন্তেকাল করেন। তার স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী পরের বছর জয়নব বিবি মারা গেলে স্বামীর পাশেই তাকে দাফন করা হয়। এখনো প্রতিদিন শত শত মুসল্লি মসজিদে নামাজ আদায় করছে এবং মাজার জিয়ারত করে যাচ্ছেন। জানা যায়, দেওয়ান শরিফ খাঁর বংশের কোনো মানুষ মসজিদ ও মাজারের তত্ত্বাবধানে নেই। তার বংশের দেওয়ান মুহম্মদ সাত্তারদাদ খাঁর ছেলে ফতোদাদ খাঁ বর্তমানে জীবিত আছেন। কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার হজরত নগরে বসবাস করেন। তিনি ঈশা খাঁর বংশধর। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি ভূমিকম্পে ফাটলটি দেখা দিলে ১৯৮৯ সালে স্থানীয় লোকজন সংস্কার করেন। এরপর সর্বশেষ গত ২০১২ সালে মসজিদটি পুনঃসংস্কারের কাজ হয়।