Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নিরাপদ হেফাজতে হত্যা চরম বর্বরতা

fb_img_1478165906409
আসাদুল্লাহ বাদল :

পুঁজিবাদী সমাজে দেশপ্রেম এক বিভৎস অভিশাপ। সেই অভিশাপে অভিশপ্ত আমাদের বীরসেনানীরা কালে কালে রক্ত ঢেলে দিয়েছে তবু শান্ত হয়নি তপ্ত ভূমি। জেলে যেতে হলে, ফাঁসির মঞ্চে যেতে হলে হিম্মত লাগে। সেরকম খাঁটি হিম্মত ছিল বিপ্লবীদের কিন্তু কোন হিম্মত ছিল না কাপুরুষদের। তাই খাঁচায় বন্দি পাখির মত গুলি করে হত্যা করেছে জেলবন্দীদের। জেলহত্যা বলে আমরা যা জানি তাকে আমি নিরাপদ হেফাজত বলতে চাই। যারা জেলের অভ্যন্তরে আটক অবস্থায় হত্যার শিকার হয়েছে তারা কেউ কয়েদি ছিলেন না। সাধারণত সাজাপ্রাপ্ত আসামীকে কয়েদী বলা হয়। তার পূর্বের অবস্থায় আটকদের বলা হয় হাজতী। কয়েদ জীবনকে জেল জীবন এবং বিচারপূর্ব সময়কে হাজতকাল বলা হয়ে থাকে। কারাগার একই প্রতিষ্ঠান হলেও অপরাধ প্রামাণিক বিষয়ে আলাদা আলাদা বা কয়েদি ও হাজতী নম্বরও আলাদা পড়ে থাকে। মোটকথা জেল হত্যার শিকার সকলেই হাজতকালিন সময়ে বা ওই সময়টি নিরাপদ হেফাজত হিসাবে বিবেচ্য। এমনকি বিচার নিস্পত্তির পূর্বসময় আদালতের হেফাজত হিসাবে গণ্য হয়। ফলত ফৌজদারি আইনে আটকদের প্রতিমাসে অন্তত দুইবার বিচারকের সামনে হাজির করতে হয়। আটক অবস্থায় কেউ মৃত্যুবরণ করলে মৃত ব্যক্তির সামনে বিচারককে অর্থাৎ একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে উপস্থিত হতে হয়। আমার এই লেখা যাদের স্মরণে তারা সকলেই আটক ছিলেন কেউ দোষী সাব্যস্ত হননি ওই অবস্থায় তাদের হত্যা করা হয়। একারণে আমি নিরাপদ হেফাজতে হত্যা বলেছি। উল্লেখ্য, জিতেন ঘোষের জেল থেকে জেলে, ডা. এম এ করিমের ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের স্মৃতি, আব্দুশ শহিদের কারা স্মৃতি, খাপড় ওয়ার্ডে সেই রক্তলাল দিনগুলি, বিপ্লবী নলিনী দাস ও মুকুন্দ দাসের কারা জীবন, সরদার ফজলুল করিমের অগ্রন্থিত রচনা, সত্যেন সেনের রচনা, আহত বিপ্লবীদের স্মৃতিচারণ ও তাদের সন্তানদের বিভিন্ন লেখা ভারতীয় উপমহাদেশে ইতিহাসের আঁকড় হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেলেও ইতিহাস ঘাতকদের কারণে জনমনের বিভ্রান্তি কাটাতে পারেনি। কেবল বিজয়ীরা ইতিহাস রচনার দায়িত্ব পালনের কারণে আসল ঘটনা ইতিহাস না হয়ে উপহাস হয়েছে। ফলত উপেক্ষিত রয়েছে, এখনো আছে, বৃত্ত ভাঙতে পারে কেবল তারাই যারা উৎসর্গ করেছে প্রাণ তাদের উত্তরসুরীরা। জেলের ভিতরে হত্যা করেছে যে কাপুরুষতা একই কাপুরুষতা ইতিহাসকে হত্যা করেছে নিজেদের রামরাজ্য কায়েম করতে।
ভারতীয় লেখক মহাশ্বেতা দেবী হাজার চুরাশির মা উপন্যাসে ও দেশীয় গণসংগীত শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু দাহকালের গানের শিরোনামে ইয়াসমিন ও সীমা চৌধুরি হত্যার পর নিরাপদ হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে রেকর্ডমত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লেখক শিল্পীরা প্রতিক্রিয়া জানালেও সবই ছিল ফরমায়েশি। ফলে ওইসব বাদ প্রতিবাদকে আমলে নিলাম না। তারপরও যদি কারো মস্তিস্কে এমন তথ্যভান্ডার থাকে তাকে স্বাগত জানিয়ে রাখছি যুক্ত হওয়ার জন্য।
পাঠকমাত্রই খেয়াল করবেন, ১৯৪৭ সালে যারা পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে স্বীকার করেনি তারা অখন্ড ভারতের অভন্ডতা স্বীকার করেছে। পরে ১৯৭১ সালে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করেনি তারা পাকিস্তানের অখন্ডতাকে স্বীকার করেছে। মোদ্দাকথা, পুরো ভূখন্ডকে ভারত বলে চলে আসছে। অথবা যারা স্বাধীনতার প্রশ্নে স্বাধীন তাদের সাবেক দেশ পাকিস্তান ও ভারত। জিন্নাহ-প্যাটেল ও গান্ধীর ষড়যন্ত্রের ফসল ভারত ভাগ আজো প্রশ্নবিদ্ধ। এই ভারতবর্ষে কত বিচিত্র ঘটনা ঘটেছে। অতিসম্প্রতি জানা গেছে সুভাষ বসু ও জওহরলাল নেহেরু সোভিয়েতের চর ছিল, তার আগে সকলেই জানত গান্ধী বৃটিশের চর ছিল। তখন সকলেই জানত গান্ধীর সাথে নেহেরুও বৃটিশ চর ছিল। লড়াই বদল হওয়ার পথে ইতিহাসও বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমি ব্যাখ্যা করার সময় সকলেই ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি মনে করেন। অথচ তারও দুইবছর আগে খাপড়াওয়ার্ডে যা ঘটেছিল তা স্বাধীন পাকিস্তানের ভিত ভাঙার মূলসূত্র।
এখন কথা হচ্ছে হাল আমলে নিরাপদ হেফাজতে হত্যা/মৃত্যু নিয়ে যারা পেছনে ফিরতে চান তাদের স্মরণে থাকবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৯ সালে বৃটিশের দেওয়া নাইট উপাধি ত্যাগ করেছিলেন। কারণ, ওইবছর ভারতের পাঞ্জাবে অমৃতসর শহরে বৃটিশ ব্রিগেডিয়ার হ্যারি ডায়ারের হুকুমে ১৬৫০ রাউন্ড গুলিতে প্রায় ২,০০০ হাজার বিদ্রোহীকে হত্যা করা হয়। তখন পাঞ্জাবের গভর্ণর ছিলেন মাইকেল ডায়ার। তখন আমরা অখন্ড ভারতের ছিলাম। এটি ইতিহাসে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড নামে পরিচিত। এই হত্যাকান্ডের শিকার বেশিরভাগ বিদ্রোহীকে বৃটিশ পুলিশ প্রথমে গ্রেফতার করে পরে হত্যা করে। আসমুদ্রহিমাচল ওই হত্যাকান্ডের শিকারদের জন্য বিশ্বব্যাপি ঘৃণার ঝড় উঠলেও শেষতক কোন বিচার হয়নি। বলা হয়ে থাকে, আইনী হেফাজতের ওই হত্যাকান্ডের হাত ধরেই আমরা এগিয়ে চলেছি। কোন নিরাপদ হেফাজতে হত্যাকান্ডেরই প্রকৃত অর্থে বিচার হচ্ছে না। ইংরেজি মিশ্রিত নতুন শব্দ আবিস্কার করেছি আমরা হাফডোজ (গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়া) ও ফুলডোজ (ক্রসফায়ার) নামে। করে দেওয়া শব্দটি এই কারণে যেসব সংবাদের ফেরিওয়ালারা ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, মিসফায়ার, গুলিবর্ষণ, গোলাগুলি শব্দবাণে নিরপরাধ মানুষকে আইনের চোখ অন্ধ রেখে হত্যা বা পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় তাদের জন্য ঘটনার শিকার ওই ব্যক্তিরা এমন অভিশাপ রেখে যায় যেন তারা ভবিষতে একই ঘটনার আবর্তে ঘুর্ণি খেতে পারে।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের কিছুদিন পর ভারতের আলীগড় জেলখানায় বিপ্লবী যতীন দাস বৃটিশের বেআইনী কর্মকান্ডের বিরোধিতা করে অনশন করে। বৃটিশের বিনা উদ্যোগে যতীন দাশের অনশন ৬৩ দিন অনশন চলাকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। চুক্তির বরখেলাপ করে বিপ্লবী ভগৎ সিং, শুকদেব ও রাজগুরুকে ফাঁসি দিয়েছিল বৃটিশরা। তাতে চুক্তির একপক্ষ গান্ধী ছিল নির্বিকার পুতুল। ১৯৪৭ সালে আমরা ভারত ভাগ করে পাকিস্তানে চলে এলেও ১৯৪৮ সালে ভারতের দমদম কারাগারে তিনজন বিপ্লবীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ভারত ত্যাগের কারণে গর্বিত হওয়ার স্থান নেই বরং কলংকের বোঝা ভারি করতে ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে রাজবন্দি বিপ্লবী শিবেন রায়কে অনশনরত অবস্থায় জোর করে দুধ পান করানোর সময় দুধ শিবেনের পাকস্থলিতে না প্রবেশ করে ফুসফুসে প্রবেশ করে। ওই অবস্থায় শিবেন রায়কে চিকিৎসা না দিয়ে সেলে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। পরে তার মৃত্যু হয়। আমরা তখন পাকিস্তানি অখন্ডতায় ছিলাম। স্বাধীন আমলে বিপ্লবী শিবেন রায় প্রথম জেল শহিদ। একই সময় খুলনা জেলে বিপ্লবী বিষ্ণু বৈরাগীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিরাপদ হেফাজতের এই হত্যার কয়েকদিনের মাথায় ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর খাপড়াওয়ার্ডে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহতম ও বেশিসংখ্যক ৪৯ জন রাজবন্দিকে গুলি করে হত্যার ষড়যন্ত্রে যথাক্রমে- কম্পরাম সিং, আনায়ার হোসেন, সুধীন ধর, দেলোয়ার হোসেন, সুখেন ভট্রাচার্য, হানিফ শেখ, বিজয় সেন এই সাত (৭) জনকে হত্যা করতে সমর্থ হন। ২৯ জন মারাত্বক আহত হন গুলিবিদ্ধ হয়ে, মাথা ফেটে। সরাসরি হত্যার এই ধারাবাহিকতা আরো অনেক খুনের পথকে প্রসারিত করেছে। এসব খুনের কাহিনী আরো নতুন খুনের পটভূমি তৈরি করেছে। আহতরা হলেন- আভরনসিং, কালী সরকার, খবির শেখ, ডা. গণেশ সরকার, ডা. জ্ঞানেন্দ্র নারায়ন সরকার, আশু ভরদ্বাজ, ভুজেন পালিত, সত্যেন সরকার, গারিস উল্লাহ, সুবীর স্যানাল, লালু পান্ডে, শীতাংশু মৈত্র, হীরেন সেনগুপ্ত, আব্দুল হক (যুক্তফ্রন্টে সাংসদ), বাবর আলী, আমিনুল ইসলাম বাদশা, আব্দুশ শহিদ, শ্যামাপদ সেন, সদানন্দ দাশ, রশিদ উদ্দিন, মাধব দত্ত, নূরন্নবী চৌধুরি, আবুল মনসুর হাবিবুল্লাহ (পরে ভারতীয় বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার, পশ্চিমবঙ্গের আইনমন্ত্রি), বংকিম চট্রোপাধ্যায়, নাসির উদ্দিন আহমদ, পরিতোষ দাসগুপ্ত, পরিমল দাশগুপ্ত, প্রসাদ রায়, অনন্ত দেব (একমাত্র জীবিত)। ওই সেলে আটকদের মধ্যে ছিলেন অমূল্য লাহিড়ী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, শচীন্দ্র চক্রবর্তী, মতিলাল বর্মণ, সফিউদ্দিন আহমদ, অনিমেষ ভট্রাচার্য্য, ডোমারাম, প্রিয়ব্রত দাস, বটুক দত্ত, মো. ইলিয়াস, ফটিক রায়, সুশীল সেন, দিলীপ সেন। কারা কর্তৃপক্ষ আহত কয়েকজনকে আগের তারিখ দেখিয়ে হাসপাতালে ভর্তি দেখান। অখন্ড পাকিস্তানে অতবড় হত্যাকান্ডের কোন বিচার তো দুরের কথা মামলাও হয়নি। নিরাপদ হেফাজতে ওই হত্যার বহর আরো লম্বা হয়েছে আরেক স্বাধীন পর্বে। কেবল পরে বাংলাদেশ আমলে একটি রাজশাহী জেলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন হয়েছে। সাতজন শহিদের বিনিময়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। কম কিসে। যেখানে কোন কোন হত্যার বিচার হয়নি। কোন স্তম্ভও হয়নি। নিরাপদ হেফাজতে ওইসব হত্যার জন্য হত্যা মামলা হলে কতটা প্রমাণ করা যেত ইচ্ছা না থাকলে? কারণ জেলহত্যার একটি মামলায় যে রায় হয়েছে তাতে বিচার না হওয়া আর হওয়ার মধ্যে তেমন কোন তফাত নেই। এই ইচ্ছা কে করে আর কে করে না এই প্রশ্নের স্বাভাাবিক উত্তর রাষ্ট্র। আমরা একশতাব্দীতে একাধিকবার রাষ্ট্র ও স্বাধীনতা বদল করলেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে পারিনি বলেই তো এই দুরবস্থা। বিনা বিচারে হত্যাকান্ডের লাইসেন্স (এক্সট্রা জুডিসিয়াল কিলিং) হয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধিদের মদদে আর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কেবল সরকারি গাড়িতে পতাকাই ওঠেনি ১,২০০ জনের বেশি বিপ্লবীকে চরমপন্থা বলে হত্যা করা হয়েছে। নিরাপদ হেফাজতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ করে (ক্লিন হার্ট) বিরুদ্ধবাদীদের হত্যার রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৫০ সালের ১১ মে ময়মনসিংহ কারাগারে কারা কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিতে মারা যায় বিপ্লবী ফনী গুহ। তারও কোন বিচার হয়নি।
ওই ঘটনার সময় রাজশাহীর জেলসুপার ডব্লিউ.এফ বিল দায়িত্বে ছিলেন। হত্যাকান্ডের সময় আজিজুর রহমান ও আরেকজন ডেপুটি জেলার, জেল ডাক্তার আব্দুল মজিদ ও একজন জেলসেপাই আটকা পড়ে ছিলেন ওয়ার্ডে। আহত অন্য বিপ্লবীরা ওই কর্মকর্তাদের হত্যা করতে পারতেন তখন। কিন্তু তা করেননি। কারণ, তাদের চেতনার জগতে বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল এবং বিপ্লবী নৈতিকতা ছিল আপাদমস্তক। ফলে সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়কে বিষয় ভাবেননি। উগ্র সা¤প্রদায়িক জেলার আব্দুল মান্নান কেবল বিপ্লবীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন পাকিস্তানি ভাবাদর্শে। এসব বিপ্লবীরা সকলেই স্লোগান তুলেছিলেন ইয়ে আজাদী জুটা হে, লাখো ইনসান ভুখা হে বলে। এটি সত্য প্রমাণিত হতে অবশ্য আরো কুড়ি বছর লেগেছিল। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল জেলসুপার মান্নানের সাথে হাজতী বিপ্লবীদের দাবি দাওয়া নিয়ে। মান্নানের একবক্তব্য বিপ্লবীরা সকলেই দেশদ্রোহী কমিউনিস্ট, তাদের কোন দাবি থাকতে পারে না। একপর্যায়ে হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করে বসে কয়েকজন বিপ্লবীকে। বলে রাখা উচিত, ওই জেলসুপারের চেয়ে প্রায় সকল বিপ্লবীরই শিক্ষা দীক্ষা ও অন্যান্য অবস্থা তুলনামূলক ভাল ছিল। চরম বর্বরতার এই ঘটনার অন্তত একটা প্রতীকি বিচার হওয়া দরকার। কারণ, জেনে শুনেই পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রি নুরুল আমিন মন্তব্য করেছিলেন ওই ঘটনাকে মানুষ মরণশীল বলে।
১৯৭৫ সালের ৩ নবেম্বর ঢাকা কারাগারে হত্যা করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও এম মনসুর আলীকে। এটিই জেলহত্যা বলে ধরে নিয়েছে অনেকে। এটি জেলহত্যা তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে পূর্বের হত্যাকান্ডের শিকার বিপ্লবীরা রাষ্ট্র ক্ষমতার ধারক বাহক হতে না পারার কারণে মোটাতাজা ইতিহাসের ভলিয়ুমে স্থান করে নিতে পারেনি। একটিকে অস্বীকার আরেকটি প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন এটি না ভাবলে পূর্বসূরীদের প্রতি কেবল অবিচার নয় অপরাধই করা হয়। বিচারের নামে যে ঘটনা স্বাধীনতার নায়কদের হত্যাকান্ডকে একরকম অস্বীকার করা হয়েছে তাই মনে হয়। সবগুলি জেলহত্যা হয়েছে শাসকগোষ্ঠরি হাতে। আর তাতে সবচেয়ে ভয়ংকর যে গোষ্ঠী ক্ষমতায় ছিল সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও এম মনসুর আলীকে হত্যার সময় তাদের একই দল ছিল, একই আদর্শ ছিল কেবল গোপন পথের ভিন্নতা ছিল। আগের হত্যাকান্ডের স্বীকাররা কখনো জুলুমের রাষ্ট্রকে মানত না বলে তাদের হত্যা করা হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতার লেবেলে তারা কখনো ফরমান জারিতে ভুল করেনি বরং বাড়িয়ে প্রচার করেছে সবকিছু। ১৯৫০ এর খাপড়াওয়ার্ডে গুলির ঘটনার আগের দিন (২৩ এপ্রিল ১৯৫০) কিশোর বিপ্লবী আনোয়ার হোসেন সিগারেট ফুকতে ফুকতে বলেছিল আগামিকাল হয়তো ধুঁয়ার মত কোথায় মিশে যাব। আর তাজউদ্দিন আহমদের স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন ২ নবেম্বর রাতে ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে হতাশ হয়েছিলেন এবং স্বপ্নের ভাবনায় তাৎক্ষণিক জেলখানায় দেখা করেছেন। দুটি ঘটনাই কাকতলীয় মনে হলেও জুলুমের বিরুদ্ধে ঠিক বিবেচনা ও বাস্তবতা নির্ভর ছিল। খাপড়াওয়ার্ডের বিপ্লবীদের মরদেহ নিয়ে যে তুলকালাম কান্ড হয়েছে একই কান্ড হয়েছে ১৯৭৫ এও। তাজউদ্দিন আহমদসহ অন্যদের হত্যার খবর নিশ্চিত করতেই চলে গেছে প্রায় একদিন। মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে গভীর রাতে। তারপর মরদেহ দেখতে আগ্রহীদের ওপর পুলিশের লাটিচার্জের ঘটনা ঘটেছে। কি স্বাধীনতা তারা এনেছিল? জানাজা দাফনেও রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করেছে। অথচ এরাই প্রথম বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে পাকিস্তানি আদলে বিশেষ ধর্ম রাষ্ট্রের পায়তারা করেছে খাঁটি অধর্মের মত।
সকল বিপ্লবী বীরসেনানীরা যে হিম্মত নিয়ে নিরাপদ হেফাজতে হত্যার শিকার হয়েছে তাদের স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়া কোন মতেই উচিতকর্ম হতে পারে না। বরং মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ কায়েম করেই কেবল তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা যেতে পারে। শহিদের রক্ত বৃথা যায় না বলে যারা বক্তব্য দেয় তাদের প্রতি আহবান আত্মবলিদান ভুলে যাবার নয়, জিইয়ে রাখার জন্য, আগামি প্রজন্মকে ইতিহাসের পালে ধরে রাখার জন্য, সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্রের জন্য প্রত্যাশা পূরণ কাম্য। যুগ যুগ জিয়ে ইতিহাসের উত্তরাধিকার বিপ্লবীগণ।
অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ বাদল: সম্পাদক, বাতিঘর। বসধরষ:নধফধষ.ড়ঢ়বহফড়ড়ৎ@মসধরষ.পড়স