Pages

Categories

Search

আজ- শুক্রবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নওগাঁয় মিথ্যে ঠিকানায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক স্বপ্না রানী সাহা


আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁ রাণীনগরে স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার না করে অস্থায়ী মিথ্যে ঠিকানায় প্রায় ৭বছর যাবত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে চাকরী করে আসছেন স্বপ্না রানী সাহা নামের এক প্রভাবশালী মহিলা।

বর্তমানে তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিশেষ বিবেচনায় নওগাঁ সদর উপজেলায় বদলী স্থান শূণ্য না থাকায় রাণীনগর উপজেলার কাশিমপুর ইউপি’র চকমনু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে কর্মরত আছেন। স্বপ্না রাণী সাহা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপজেলা ভিত্তিক কোঠায় স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার না করে বর্তমান ঠিকানা ব্যবহার করে চাকুরী নেওয়ার প্রমাণ তথ্যঅনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের উদাসীনতায় সরকারি পর্যায়ে এমন জালিয়াতী করা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতনমহল। কিভাবে এমন হওয়া সম্ভব এই রকম হাজারো প্রশ্নের জল্পনা-কল্পনার ঝড় বয়ছে বর্তমানে রাণীনগরের সর্বত্র।

জানা গেছে, নওগাঁ সদর উপজেলার সুলতানপুর মহল্লার মনোরঞ্জন সাহা’র মেয়ে স্বপ্না রাণী সাহা’র বিয়ে হয় নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের পারশাঔল গ্রামের মৃত-প্রতিভা নাথ সাহার ছেলে প্রদীপ সাহার সঙ্গে। স্বামী প্রদীপ সাহা আশা এনজিওতে চাকরী করেন। এই চাকরীর সুবাধে প্রদীপ সাহা ২০১০ইং সালে জেলার আত্রাই উপজেলার সদরে চাকরী করতেন। সেখানে বাসা ভাড়া করে থাকতেন প্রদীপ সাহা ও স্বপ্না রানী সাহা। এই সময় তারা এই এলাকার ভোটার হিসাবে নাম নিবন্ধন করেন। আত্রাই থাকাকালীন সময়ে গত প্রায় সাড়ে ৭বছর আগে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে উপজেলা ভিত্তিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে স্বপ্না রাণী সাহা নিজের স্থায়ী ঠিকানা বাদ দিয়ে নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলা সদরের সাহেবগঞ্জ মহল্লার (সেই সময়ের ঠিকানা) ঠিকানা দিয়ে আবেদন করেন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আত্রাই উপজেলার ৬৯নং তিলাবদুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে গত ২১/০৯/২০১০ইং তারিখে যোগদান করেন।

তার স্বামী প্রদীপ সাহা বর্তমানে আত্রাই উপজেলা থেকে বদলি হয়ে জেলার বদলগাছী উপজেলায় আশা এনজিও’র পারসোমবাড়ী শাখার ব্যবস্থাপক হিসাবে কর্মরত। নিজেদের সুবিধার্থে বর্তমানে এই পরিবার নওগাঁ সদরের সুলতানপুর এলাকায় বসবাস করছেন। আত্রাই উপজেলায় দীর্ঘ প্রায় ৫বছর চাকরী করার পর অধিদপ্তরের ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তার সহযোগীতায় বদলী আদেশ নিয়ে রাণীনগর উপজেলার চকমনু সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫/০১/২০১৫ইং তারিখে যোগদান করেন ।

তার বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ। তিনি এই বিদ্যালয়ে যোগদান করার পর পরই বিদ্যালয়ের অনেক বই ও খাতা বিক্রয় করেন। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ আচার-আচরন করা তার নিত্যদিনের সঙ্গী। বিভিন্ন ক্লাসের শিক্ষার্থীরা জানান তিনি কক্ষে পাঠদান করার সময় ফোন এলে কথা বলার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা বাহিরে গিয়ে কথা বলেন। তার কাছে কোন কিছু শিখতে চাইলে এবং কারণে-অকারণে শিক্ষার্থীদের মারধর করেন বলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জানায়।

সম্প্রতি বই বিক্রয় করার প্রসঙ্গে সহকারী শিক্ষকরা কিছু জানেন না বলার কারণে স্বপ্না রানী সাহা স্কুল চলাকালীন সময়ে নওগাঁ সদর থেকে কিছু মাস্তান নিয়ে এসে বিভিন্ন রকমের ভয়ভীতি ও হুমকি-ধামকী দিলে সহকারী শিক্ষকরা প্রচন্ড নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন। পরবর্তিতে সহকারীরা থানায় একটি জিডি করেন এবং বিভাগীয় তদন্তের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ প্রদান করেন। সম্প্রতি তদন্তে স্বপ্না রানী সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুলো সত্য হওয়ায় উপজেলা শিক্ষা অফিস বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করেছে বলে অফিস সূত্রে জানা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও রাণীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় হতে স্মারক নং-২৬২৯,১৩/০৯/২০১০ইং তারিখে প্রেরণকৃত স্বপ্না রাণী সাহার নিয়োগপত্র ও তার সার্ভিস বইয়ের ৩নং পাতায় স্থায়ী ঠিকানার জায়গায় (তৎকালীন সময়ের বর্তমান ঠিকানা) স্বামী-প্রদীপ সাহা, গ্রাম: সাহেবগঞ্জ, পো: আহসানগঞ্জ, উপজেলা: আত্রাই, জেলা: নওগাঁ এই ঠিকানা লিখা রয়েছে। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ের পর চাকরী হলে স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু স্বপ্না রানী সাহার ক্ষেত্রে তা সম্পন্ন ভিন্ন চিত্র।

জেলার আত্রাই উপজেলার সাহেবগঞ্জ এলাকার স্থানীয় মেম্বার আব্দুল হাকিম শেখ জানান, প্রদীপ সাহা ও স্বপ্না রানী সাহা আমার এলাকার ভোটার। তবে তারা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নন। প্রদীপ সাহা এই এলাকায় যখন চাকরী করতেন তখন তারা এখানে ভাড়া থাকতেন।

নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের পারশাঔল এলাকার স্থানীয় মেম্বার হাতেম আলী জানান, প্রদীপ সাহা আমার ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি আশা এনজিওতে চাকুরী করেন ও তার এক ভাই কলেজের প্রভাষক। ওদের পরিবারের সবাই খুব ভাল এবং ভদ্র।

প্রধান শিক্ষিকা স্বপ্না রাণী সাহার কাছে তার স্থায়ী ঠিকানা সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এই বিষয়ে আপনাদের (সাংবাদিকদের) সাথে কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি না। তাই আপনারা এখন আসতে পারেন।

রাণীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: মজনুর রহমান জানান, একজন নাগরিক দেশের যে কোন স্থানের ভোটার হতে পারেন কিন্তু সরকারি চাকরীর ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রার্থীকে ওই স্থানের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে যদি স্বপ্না রানী সাহা চাকুরি নিয়ে থাকেন তাহলে অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম আমিরুল ইসলাম জানান, শুধু বর্তমান ঠিকানাই নয় অবশ্যই প্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। স্বপ্না রানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।