Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ২১ নভেম্বর ২০১৮

নওগাঁয় কৃষকের চোখের পানিতে ভিজছে দুঃখ ঘোচানোর খাল

মে ১২, ২০১৮
নওগাঁ
No Comment

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ : নওগাঁর সদর উপজেলার হাসাইগাড়ী বিলে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে খান খননের অভিযোগ উঠেছে। জনসাধারণের জমিতে খাল খনন করলেও বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) কোনো ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ জমির মালিকদের। ফলে কৃষকদের দুঃখ ঘোচাতে গিয়ে ওই খাল এখন কৃষকের চোখের পানিতে ভিজছে।

বিএমডিএ নওগাঁ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ জেলার ভূ-পরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের আতওয়ায় নওগাঁ সদর উপজেলার হাঁপানিয়া, দুবলহাটী, বলিহার, হাঁসাইগাড়ী, বিল মনসুর, পাকুড়িয়া বিল, নলীর বিল ও বারমাসিয়া বিল, হ্যামড়ার বিল ও গুটার বিলের ৩৭ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন কাজ শুরু হয় ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে। এতে ওই সব বিলের ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা দূর হবে এবং বোরো মৌসুমে সেচে খালের পানি ব্যবহার করা যাবে। আমন মৌসুমে খাল দ্রæত বন্যার পানি নেমে যাওয়ার ফলে আমান আবাদ করা সম্ভব হবে। খাল খননের গভীরতা ৬ মিটার থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত এবং প্রস্থ সর্বোচ্চ ৪৫ মিটার থেকে ১৬ মিটার পর্যন্ত করা হচ্ছে। ৩৭ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন কাজের ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। খাল খননের কাজ ছাড়াও পাঁচটি সাব মার্জড ওয়ারসহ ফুট ব্রিজ ও তিনটি পারাপার ড্যাম ক্রসড্রেন করা হচ্ছে। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা।

সরেজমিনে হাসাইগাড়ী বিল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার হাসাইগাড়ী ইউনিয়নের ভিমপুর, কাঠখৈর ও হাতাস গ্রামের হাইসাইগাড়ী বিলের মধ্য দিয়ে বিএমডিএ-এর খাল পুনঃখনন কাজ চলছে। খাল খননের কোথাও মানদÐ (মাটি পরিমাপের ঢিবি বা কাপড়েরর নিশানা) চোখে পড়েনি।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, জমি অধিগ্রহণ না করে এবং কোনো কোনো নোটিশ ছাড়াই বিএমডিএ জোর করে এই খাল খনন করছে। অনেক কৃষকের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর মধ্য দিয়ে খাল খনন করা হচ্ছে। অথচ বিলের মধ্যে অনেক খাস জমি থাকলেও সে দিক দিয়ে খাল খনন করা হচ্ছে না। জমির মালিকেরা বাধা দিতে গেলে পুলিশের হয়রানির ভয় দেখানো হচ্ছে।

ভিমপুর গ্রামের সাইদুর রহমান, শহিদুল ইসলাম, শফির উদ্দিন, আব্দুর রশিদ, হাফিজুর রহমান, কাঠখৈর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম, হাতেম আলী, আনিছার রহমান অন্তত ৩০ কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে যেখানে ৪ থেকে ৫টার প্রশস্ত খাল ছিল। সেটা এখন ৩০-৪০ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করা হচ্ছে। খাস জমি না থাকলেও একই মাপে খাল খনন করা হচ্ছে। এর ফলে ৫কাঠা, ১০কাঠা থেকে শুরু করে কারও দুই-তিন বিঘা পর্যন্ত ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি খালের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কোনো কাজই হয়নি। অনেককে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির পরিবর্তে অন্য জায়গায় খাস জমি দিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বললেও তা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

ভিমপুর গ্রামের কৃষক মোখলেছার রহমান বলেন, ‘হাসাইগাড়ী বিলের মধ্যে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া চার বিঘা জমি আমরা চার ভাই ভোগদখল করে আসছি। এবার আমাদের ওই জমির ওপর দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। আমাদের ২ বিঘা ৫ কাঠা জমি খালের মধ্যে চলে গেছে। বিএমডিএর কাছে অভিযোগ করে এবং জমির কাগজপত্র দেখানোর পরেও তারা জোর করে খাল খনন করেছে। ক্ষতিপূরণ পাব কিনা সেটারও কোনো নিশ্চিয়তা পাচ্ছি না।’

একই গ্রামের বাসিন্দা আহমেদ আলী নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘দুই বছর আগে একজনের কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে ১৮ শতক মাটি কিনে নেই। এবার আমার ওই জমির মধ্য দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। ১৮ শতক জমির পুরোটাই খালের মধ্যে চলে গেছে। ওই জমিতে মাত্র একবার ধান আবাদ করতে পেরেছি। এবারও ধান আবাদ করেছিলাম। কিন্তু খাল কাটা লোকজন সেই ধান কাটারও সুযোগ দেয়নি। ধানসহ জমির মাটি কেটে খাল করেছে।’

বিএমডিএ নওগাঁ কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী ও ওই প্রকল্পের স্থানীয় তত্ত¡াবধানকারী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কোনো খাল খননেই জমি অধিগ্রহণ করা হয় না। এই খাল খননেও জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। আমার জানা মতে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে কোনো খাল খনন করা হয়নি। তবে অনেক ক্ষেত্রে খালের পাড়ের জন্য যে মাটি ফেলা হচ্ছে, সে সব মাটি কৃষকের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে গিয়ে পড়ছে। এরপরেও বেশ কিছু কৃষক আমাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসছেন। আমরা তাঁদের অভিযোগ খতিয়ে দেখছি। অনেক সময় আমরা নিজেরা সার্ভেয়ার নিয়ে গিয়ে কৃষকদের জমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই সব বিলে জমি নিয়ে প্রকৃতপক্ষে অনেক জটিলতা রয়েছে। এই বিলগুলোতে সরকারের প্রায় এক হাজারের উপরেও খাস জমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই সব জমি সরকারের তত্ত¡াবধানে না থাকায়। অনেক ব্যক্তি সরকারের কাছ কিছু দিনের জন্য পত্তন নিয়ে সেগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে অন্যের কাছে বিক্রি করেছেন। ওই সব মালিকারা এখন ওই জমি তাঁদের বলে দাবি করছে। আসলে ওই জমিগুলো খাস। তদন্তে গিয়ে এ ধরণের অনেক প্রমাণ আমরা পাচ্ছি।’

ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, খাল খননে কোনো প্রকার অনিয়ম হচ্ছে না। এছাড়া কৃষকদের পুলিশের ভয় দোখানো কিংবা কোনোভাবে হয়রানি করা হচ্ছে না।

জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ ধরণের কোনো অভিযোগ কৃষকেরা আমার কাছে করেনি। অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপরেও কৃষকেরা হয়রানি কিংবা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কিনা এ ব্যাপারে আমি বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।’