Pages

Categories

Search

আজ- মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নওগাঁয় ইরি-বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ে শ্রমিক সংকট, কৃষকের মাথায় হাত

এপ্রিল ২৪, ২০১৬
কৃষি, নওগাঁ, বিশেষ প্রতিবেদন
No Comment

Raninagar Paddy Pic.2আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি:
নওগাঁ জেলার রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলা হচ্ছে ধান চাষের জন্য বিখ্যাত। রাণীনগরে চলতি ইরি-বোরো মৌসুমের ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ পুরোদমে শুরু হলেও ব্যাপক শ্রমিক সংকটে এলাকার কৃষক। একদিকে ধানের মূল্য না থাকায় লোকসান গুনতে হচ্ছে অপরদিকে ব্যাপক শ্রমিক সংকটে বর্তমানে উপজেলার কৃষকদের মাথায় হাত। চাহিদা মতো শ্রমিক না পেয়ে স্বাভাবিকের চেয়েও দ্বিগুন মূল্য দিয়ে শ্রমিক সংগ্রহ করতে হচ্ছে কৃষকদের। কালবৈশাখী ঝড় ও আবহাওয়া প্রতিক‚লে যাওয়ার আগেই কৃষকরা তাদের কষ্টের ফসলকে ঘরে নিতে চায় বলে তাদের দ্বিগুন হারে এই লোকসান দিতে হচ্ছে বলে এলাকার কৃষকরা জানান।

কৃষকরা আরো জানান, প্রতিবছর দেশের যে সব এলাকা থেকে আমাদের এই এলাকায় শ্রমিকরা কাজ করতে আসতো বর্তমানে সেই সব এলাকার মানুষরা আমাদের দেখাদেখি ও কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে ধান চাষ শুরু করেছেন। তাই উল্লেখযোগ্য হারে আর ওই এলাকার শ্রমিকরা আমাদের এই এলাকায় কাজ করতে আসছে না বলে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। অপর দিকে স্থানীয় শ্রমিকরা বাজার দর ঊর্দ্ধমুখি বলে দ্বিগুন মূল্য আদায় করছেন। এতে কৃষকরা অনেকটায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন শ্রমিকদের কাছে।

BenQ Corporationএখন উপজেলার বিভিন্ন মাঠের কোন কোন জায়গায় দেখা যাচ্ছে শ্রমিকরা ধান কাটছে আবার কেউ কেউ সেই কাটা ধান কাঁধে করে নিয়ে আসছে কৃষকের বাড়িতে। গত আমন মৌসুমে ভয়াবহ বন্যায় অধিকাংশ আমন ধানের জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে ইরি-বোরো চাষের জন্য রাসায়নিক সারসহ কৃষি উপকরণ বিতরণের ফলে একটু আগাম সময়েই কৃষকরা ইরি-বোরো ধান চাষ করেছিলেন। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবার ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এবার প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ২২ মণ ও হাইব্রিড জাতের ৩২ মণ হারে ধানের ফলন পাওয়া যাবে যা বিগত দিনের চেয়ে অনেক বেশি। তবে মাঠের কিছু নিচু জমিতে ইউরিয়া সারের পরিমাণ বেশি দেওয়ায় সেগুলোতে ফলন একটু কম হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে শিলা বৃষ্টি ও ঝড়ে সার বেশি দেয়া জমিগুলোর ধান পড়ে যাওয়ায় কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়লেও অন্য জমির ধানের ফলনে সেই ক্ষতি পুশিয়ে নিতে পারবেন বলে কৃষকরা আশা প্রকাশ করেন।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় ১৯ হাজার ১শত হেক্টর চাষযোগ্য আবাদী জমিতে ইরি-বোরো চাষ করেছেন কৃষকরা। অনুক‚ল পরিবেশ থাকায় ও কোন প্রকার রোগবালাই ছাড়া এবার ইরি ধান-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এই ইরি-বোরো মৌসুমে কৃষকরা জিরাশাইল, বিরি ধান-২৮ ও ২৯, বিভিন্ন জাতের হাইব্রিড, খাটো-১০ ও পারিজা জাতের ধান চাষ করেছেন। তবে এগুলোর মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই জিরাশাইল জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মাঠ পর্যবেক্ষণ করে কৃষকদের যথাযথ ভাবে পরিচর্যা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজারে ধানের দাম নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন এলাকার কৃষকরা। যদি কৃষকরা তাদের ধানের ন্যায্য মূল্য না পান তাহলে উচ্চ হারে কৃষকদের লোকসান গুনতে হবে বলে আশংকা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ।

উপজেলার বড়গাছা ইউপির কাটরাশইন গ্রামের দুলাল সরকার জানান, ইরি-বোরোর এই মৌসুমে তার ২৫ বিঘা জমিতে ধানের বাম্পার ফলন হলেও বর্তমানে তিনি ব্যাপক শ্রমিক সংকটে ভুগছেন। দ্বিগুন মূল্য দিয়েও প্রয়োজন মতো শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে আমাদের প্রতি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে ৭শত থেকে ৮শত টাকা পর্যন্ত। একদিকে শ্রমিক সংকট অপরদিকে ধানের মূল্য নেই। এতে আমাদের অনেক লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

Raninagar Paddy Pic.5মিরাট ইউপি’র আতাইকুলা গ্রামের আইয়ুব হোসেন জানান, প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে তিনি এই মৌসুমে জিরাশাইলসহ বিভিন্ন জাতের হাইব্রিড ধান চাষ করেছেন কিন্তু শঙ্কা হচ্ছে ধানের মূল্য নিয়ে। অপরদিকে শ্রমিক সংকট। উভয় দিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করলে কৃষকরা একটু হলেও লাভবান হবে। তাই আমাদের মতো কৃষকদের কথা ভেবে সরকারের উচিৎ ধানের মূল্য বাড়ানো। তা না হলে কৃষকরা মাঠে মারা যাবে।

রাণীনগর ইউপি’র উপজেলার সিম্বাগ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, বিগত দিনে কৃষকরা ধান চাষ করে লাভের মুখ দেখতো কিন্তু এবার কৃষকদের মাথায় হাত। বর্গাচাষীরা সবচেয়ে বেশি লোকসানের মুখে পড়বে। কারণ প্রতিবিঘা জমির ভাড়া সহ মোট খরচ হয় প্রায় ১৭ হাজার টাকা। ধানের দাম ও শ্রমিক খরচ নিয়ে ছোটখাটো চাষীরা উভয় সংকটে পড়েছে। কৃষকদের বাঁচানোর জন্য সরকারের উচিত ধানের দাম বাড়ানো।

রাণীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস.এম.গোলাম সারওয়ার জানান, সরকারি ভাবে কৃষকদের ধান কাটা ও মাড়াইয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সম্পর্কে উৎসাহিত করলে শ্রমিক সংকট অনেকটাই কমে আসবে। এই যন্ত্রপাতি দ্বারা কৃষকরা অতি অল্প সময়ে ও খরচে ধান কাটতে ও মাড়াই করতে পারবেন। এতে কৃষকরা অনেকটাই লাভবান হবেন। যখনই আধুনিক মান সম্মত এই যন্ত্রগুলোর ব্যবহার কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে তখন কৃষকদের আর শ্রমিক সংকটের মুখে পড়ে লোকসান গুনতে হবে না।