Pages

Categories

Search

আজ- বৃহস্পতিবার ১৫ নভেম্বর ২০১৮

নওগাঁর রাণীনগরের আদর্শ গ্রাম এখন অবৈধ্য কার্যক্রমের আখড়া

জানুয়ারি, ১৬, ২০১৮
অপরাধ, আইন- আদালত, নওগাঁ, মাদক
No Comment

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি: ‘আমার ২য় ছেলে সোহেল এক সময় উপজেলায় দোকান দিয়ে ফলের ব্যবসা করতো। সবার অজান্তে সে গ্রামের মাদকাসক্ত ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করায় আজ প্রায় ৩বছর যাবত সে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। সে ফলের দোকান লাটে তুলে দিয়ে আমার পরিবারকে সর্বশান্ত করে ফেলেছে। নেশার টাকা না পেলে সে পাগল হয়ে যায়। বাড়িতে রাখা ঘরের জিনিসপত্র ভেঙ্গে সাবার করে দেয়। সোহেলকে নিয়ে আমি এখন মহা বিপদে রয়েছি। আমার সোনার ছেলে এই গ্রাম ও আশেপাশের গ্রামের কিছু মাদকাসক্ত ছেলেদের সঙ্গে মিশে নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এখন কি করবো তা ভেবে পাই না।’ এই কথাগুলো বলেন এক সময়ের আদর্শ গ্রাম বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত-ছলিম সরদারের ছেলে ফল ব্যবসায়ী মেছের আলী তার মাদকাসক্ত ছেলে সোহেল সম্পর্কে। শুধু মেছের আলীই নন এই গ্রামে এরকম শতাধিক অভিভাবক রয়েছেন যারা বর্তমানে একই পথের পথিক হয়েছেন।

তাই রাণীনগর উপজেলায় আবারও বেড়ে গেছে মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত লোকজনের দৌরাত্ম। উপজেলার যেখানে-সেখানে হাত বাড়ালেই এখন পাওয়া যায় হিরোইন, মদ, ফেন্সিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন রকমের মাদকদ্রব্য। বিশেষ করে উপজেলার ২নং কাশিমপুর ইউনিয়নের এক সময়ের আদর্শ গ্রাম বাহাদুরপুর গ্রামে এর পরিমাণ অনেক বেশি। পাশের পশ্চিম বালুভরা গ্রামেরও একই অবস্থা। এতে করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এই এলাকার বাসিন্দারা।

গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে রাস্তার দুই পাশের সবুজের সমারোহ। মাঝে মাঝে কাঁচা-পাঁকা বাড়ি। এই গ্রামটি হলো এক সময়ের আদর্শ গ্রাম বাহাদুরপুর। কিন্তু বর্তমানে গ্রামের একটু ভেতরে প্রবেশ করতেই সহজেই দেখতে পাওয়া যায় ঝোঁপ-ঝাড়ের রাস্তার পাশে পড়ে আছে ফেন্সিডিলের বোতল। বাঁশ ঝাড়ের মাঝে রাতের আঁধারে বাতি জ্বেলে জুয়া খেলার দৃশ্য সহজেই চোখে পড়ার মতো।

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা কাশিমপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামকে কয়েক বছর আগে আদর্শ গ্রাম বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই আদর্শ গ্রাম এখন মাদক সেবন, বিক্রয়, রাতে জুয়া খেলা ও চুরি ছিনতাইসহ বিভিন্ন অবৈধ্য কার্যক্রমের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। রাণীনগর থানা থেকে এই গ্রামের দূরত্ব মাত্র ১কিলোমিটারের মতো হলেও এসব অবৈধ্য কার্যক্রম চলছে অবাধেই।

দিন কে দিন এসব অপকর্ম বাড়তে থাকায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে গ্রামবাসী। কখন যে কার বাড়ি, দোকান কিংবা পুকুর চুরি হয় সেই আতঙ্ক নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে সবাইকে। শুধু আদর্শ গ্রাম নয়, মাদকসেবী ও বিক্রেতাসহ চোরদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পড়েছেন আশেপাশের কয়েক গ্রামের মানুষও।

শান্তির সেই আদর্শ গ্রাম এখন দুর্বৃত্তদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এই গ্রাম থেকেই শিশু অপহরণকারীর একটি কুখ্যাত দলকে আটক করে পুলিশ। এই গ্রাম থেকেই এলাকার যাবতীয় অপকর্মের নীল নকশা করা হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। গ্রামের এহেন অবস্থায় মনের অজান্তেই অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে অনেক উড়তি বয়সের যুবকরা।

বাহাদুরপুর গ্রামের মৃত-মুনছুর আলীর ছেলে জালাল সরদার জানান, মাস খানিক আগে তার পুকুরের প্রায় লাখ টাকার মাছ চুরি করেছে দুর্বৃত্তরা। পুকুরটি খাস হওয়ায় পূর্বপরিকল্পিত ভাবেই দুর্বৃত্তরা এই কাজটি করেছে।

একই গ্রামের মৃত-আফতাব উদ্দিনের ছেলে খন্দকার ইয়াছিন আলী (অব: আর্মি) বলেন, গত ৪ মাস আগে আমার বাড়ি থেকে কয়েকটি মোবাইল ফোন, ভিডিও ক্যামেরা ও নগদ প্রায় ৮৫ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে দৃর্বৃত্তরা। এই বিষয়ে থানা পুলিশ সচারচর কোন অভিযোগ নিতে চায় না। আবার অনেক অনুরোধ করে অভিযোগ দিয়ে আসলেও পরবর্তিতে কোন কাজ হয় না। গ্রামে যারা এই সব কর্মকান্ড ঘটিয়ে আসছে তারা সব সময় বহাল তবিয়তেই বসবাস করে আসছে এবং দিনের পর দিন এই সব অপকর্ম করে আসছে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

বাহাদুরপুর বাজারের মো: রুবেল হোসেন নামে এক মুদীর দোকানদার জানান, কিছুদিন আগে তার দোকান থেকে ৪০-৫০হাজার টাকার মালামাল রাতের আঁধারে চুরি হয়ে গেছে। গ্রামের কিছু মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা দিনের পর দিন এই সব কর্মকান্ড করে আসছে। তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা অতিব জরুরী।

একই গ্রামের মো: নুরু হোসেন বলেন, সম্প্রতি দিনে-দুপুরে আমার বাড়ি থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা মূল্যের মোবাইল ফোন গ্রামেরই কিছু চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা চুরি করে নিয়ে যায়। দুর্বৃত্তদের একজন আমাকে বলে যে ‘আমাদের কিছু টাকা দিলে আমরা ফোন বের করে দিবো’। পরবর্তি সময়ে এই ঘটনায় থানা পুলিশ অনেক নাটক করার পর আমার কাছ থেকে থানা পুলিশের ডিএসবি বিভিন্ন স্থানে দেওয়ার নাম করে ৬হাজার টাকাসহ একাধিক লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করে। কিন্তু সেই চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি আজ পর্যন্ত পুলিশ আমার মোবাইল ফোনও উদ্ধার করে দিতে পারেনি।

তিনি আরো জানান, সেই দুর্বৃত্তরা আমাকে রাতের আঁধারে রাস্তা-ঘাটে বিভিন্ন রকমের হুমকি-ধামকী দিয়ে বলে ‘পুলিশকে টাকা দিলে সব হয়। তুই থানায় অভিযোগ দিয়ে কী করবি?’ তাই বর্তমানে আমিসহ গ্রামের সব মানুষই চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

বাহাদুরপুর গ্রামের মাতব্বর মো: মোজাম্মেল হক (অব: বিডি আর) জানান, বর্তমান সময়ে আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি হওয়ার কারণে গ্রামের চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা এই সব কর্মকান্ড ঘটানোর সাহস পাচ্ছে। পূর্বে গ্রাম্য নেতাদের হাতে বিচার করার ক্ষমতা ছিলো কিন্তু এখন নেই। যার কারণে গ্রামবাসী এখন এই সব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন কিছুই করতে পারছে না। আবার যাদের হাতে ক্ষমতা অর্থাৎ পুলিশ, তারাও কিছুই করছে না। তাই কেউ কাউকে মানতে চায় না। অপরদিকে দলীয় প্রভাবতো রয়েছেই। এখন আমাদের এই গ্রাম আর আদর্শ গ্রাম নেই। আমরা কতিপয় মানুষের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছি। এই সব চিহ্নিত কতিপয় দুর্বৃত্তদের আস্তানা এই গ্রাম থেকে শেকড়সহ উৎপাটন করতে পারলেই আবার বাহাদুরপুর গ্রাম আদর্শে গ্রামে পরিণত হবে বলে আমি আশাবাদী।

একই গ্রামের মৃত-মফিজ সরদারের ছেলে মো: আজিজ হোসেন বলেন, এই সব অপকর্মের প্রতিবাদ করায় আমি এখন দৃবৃর্ত্তদের দু’চোখের বালি হয়ে গেছি। একাধিকবার আমি এই সব দুর্বৃত্তদের আক্রোশ থেকে প্রাণে বেঁচে গেছি। এই গ্রামের কিছু প্রভাবশালী মাতবর রয়েছেন যাদের শত্রছাঁয়ায় দীর্ঘদিন যাবত চিহ্নিত কিছু দুর্বৃত্তরা দিনের পর দিন এই সব কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে। আজ তারা এই গ্রামটিকে মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। মাঝে মধ্যে পুলিশরা এসে একজন-দুজনকে ধরে নিয়ে যায় আবার পরে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। আমরা এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাই।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো: মোখলেছুর রহমান বাবু বলেন, আমার কাছে এইসব বিষয়ে কোন অভিযোগ নেই। আর যে সব অভিযোগ পাই তা সঙ্গে সঙ্গে সমাধান করার চেষ্টা করি। তবে এই সব অনৈতিক কর্মকান্ড বিষয়ে আমার কাছে লিখিত ভাবে অভিযোগ এলে তা শক্ত হাতে দমন করার চেষ্টা করবো।

এ ব্যাপারে রাণীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ.এস.এম সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমি এই থানায় কিছুদিন হলো যোগদান করেছি তাই আমি এসব ব্যাপারে তেমন ভালো কিছু জানি না। আমরা মাদক নির্মূলে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রেখেছি। তবে বিষয়টি অধিক গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে।