Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নওগাঁর গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের ভরসা ঝুঁট কাপড় থেকে দঁড়ি তৈরী

জানুয়ারি, ৩০, ২০১৮
নওগাঁ, বিশেষ প্রতিবেদন
No Comment


আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি :“অভাব-অনটনের সংসারে প্রতিবেশীদের সহযোগীতায় বড় মেয়েকে কলেজে পড়াশুনা করাচ্ছিলাম। পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। স্বামী বক্ষ ব্যাধী রোগে আক্রান্ত। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলাম আমি। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে বড় মেয়ে মারা যাওয়ায় যেন দুংখের আর শেষ নেই পরিবারটিতে। যখন অভাবের সাথে পাল্লা দিয়ে দিশেহারা ঠিক তখনই এক নিকট আত্মীয়ের পরামর্শে ঝুঁট কাপড় দিয়ে দঁড়ি তৈরীর কাজ শুরু করি।” এভাবেই নওগাঁ সদর উপজেলার ইলশাবাড়ি গ্রামের জীবন যুদ্ধে সফল গৃহবধূ ফেরদৌসী আকতার তার বেঁচে থাকার কথাগুলো বলছিলেন।

গত ৬ বছর থেকে দঁড়ি তৈরী এবং বিক্রি করে বেশ ভাল লাভ আসতে থাকে। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ফেরদৌসীকে। দঁড়ি তৈরীর আয় দিয়ে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা, ঔষধপত্র ক্রয়, সংসারের যাবতীয় খরচ এবং এক ছেলে ও এক মেয়েকে পড়াশুনার খরচ সংকুলান সম্ভব হচ্ছে। সংসারে ফিরে এসেছে স্বচ্ছলতা।

শুধু ফেরদৌসি আকতার নয় এরকম শত শত গ্রামীণ গৃহবধূ আছে যারা আজ এই ঝুঁট কাপড় দিয়ে দঁড়ি তৈরি করে আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। নওগাঁ সদর উপজেলার ইলশাবাড়ী, মাদারমোল্লা, চকবুলাকী, শিমুলিয়া, বলিরঘাট এবং রাণীনগর উপজেলার এনায়েতপুর, পূর্ব বালুভরা, রাজাপুর ও বাহাদুরপুর, দড়িয়াপুরসহ প্রায় ১০/১২টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার গ্রামীণ নারী গার্মেন্টসের এই ঝুট কাপড় থেকে দঁড়ি তৈরীর সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এ যেন এক জীবনযুদ্ধে জয়লাভের সফল কাহিনী।

ঝুঁট কাপড় (গার্মেন্টেসের পরিত্যাক্ত কাপড়) দিয়ে বিশেষ ভাবে দঁড়ি তৈরী করে গ্রামীণ অনেক নারীরা আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়ে সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছেন। নওগাঁ সদর ও রাণীনগর উপজেলার ১০ থেকে ১২টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার নারী এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দারিদ্রতার কষাঘাত মুছে ফেলে তাঁরা তাদের সংসারে ফিরে এনেছেন সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ।

এসব নারী সংসারের কাজ শেষ করে বাড়তি আয়ের জন্য দঁড়ি তৈরীকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এই ঝুঁট কাপড় থেকে আকর্ষনীয় শিকা, গরু ও ছাগল বাঁধার জন্য দঁড়ি তৈরী করছেন তারা। এ কাপড় থেকে তৈরী দঁড়ি মজবুত ও টেকসই বলে পানের বরজে বেশি ব্যবহার উপযোগী হওয়ায় এসবের চাহিদাও বেশি। বিভিন্ন বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো থেকে ঋণ নিয়ে অনেক নারী এই দঁড়ি তৈরীর কাজ করছেন। পরে দঁড়ি বিক্রি করে তাদের ঋণ শোধ করেও লাভের মুখ দেখছেন। তবে তারা বলেছেন সরকারী সহযোগীতা ও স্বল্প সুদে ঋণ পেলে তাদের এই কাজের প্রতি আরও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।

প্রতিটি ঝুঁট কাপড়ের বস্তার ওজন ৮০-৮৫ কেজি। প্রতিকেজি ঝুঁট কাপড়ের দাম ৪৫ টাকা। সেই হিসেবে এক বস্তা ঝুঁট ক্রয় করতে তাদের খরচ হয় সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। একটি বস্তা ঝুঁট থেকে তৈরী দঁড়ি বিক্রি হয় সাড়ে ৪ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। একজন নারী প্রতি সপ্তাহে ২ বস্তা ঝুঁটের দঁড়ি তৈরী করতে সক্ষম। কাজেই এক বস্তা ঝুঁট থেকে তৈরী দঁড়ি বিক্রি করে লাভ করতে পারেন প্রায় ৭০০ টাকা। এভাবে প্রতিমাসে একজন নারী গড়ে ৮ বস্তা ঝুঁট থেকে দঁড়ি তৈরী করতে পারেন। সহজেই একজন নারী প্রতিমাসে ৫ হাজারের বেশী টাকা নীট লাভ করে থাকেন। যেহেতু সংসারের অন্যান্য সকল কাজের ফাঁকে এই কাজগুলো তারা করে থাকেন কাজেই এটি অত্যন্ত লাভজনক। এমনকি কোন কোন পরিবারের সকল সদস্য মিলে এই কাজ করে থাকেন। সে সব পরিবারে লাভের পরিমাণ আরও বেশী।

সদর উপজেলার ইলশাবাড়ী গ্রামের ফেরদৌসি আকতার ও রেবেকা বিবি, মাদারমোল্লা গ্রামের আকলিমা বেগম ও জরিনা আকতার, শিমুলিয়া গ্রামের আয়শা বেগম, দড়িয়াপুর গ্রামের কুলসুন, রাজাপুর গ্রামের আকলিমা আক্তারসহ অনেকেই বলেন প্রতি সপ্তাহে দঁড়ি বিক্রি করে প্রায় দেড় হাজার টাকার মতো লাভ থাকে। আর এখান থেকে পরিবারের ঔষধপত্র, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ সংকুলান এবং নিত্য প্রয়োজনীয় সংসার খরচ সহজেই মেটানো সম্ভব হচ্ছে। তারা আরো বলেন আল্লাহর রহমতে আগের চেয়ে এখন অনেক ভাল ভাবে জীবন-যাপন করতে পারছি।

এই পেশাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একশ্রেণীর দঁড়ি কেনার দল। নওগাঁ সদর উপজেলার ঝুঁট কাপড় ব্যবসায়ী আসলাম হোসেন বলেন, বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসে ঝুঁট কাপড় কিনে যায় নারীরা। এরপর তারা দঁড়ি তৈরী করে আবার আমার কাছে বিক্রি করে। আর এসব দঁড়ি বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যায়।

নওগাঁ শিল্প সহায়ক কেন্দ্র (বিসিকি)-এর উপ-ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম বলেন দরিদ্রজন গোষ্ঠীর জনগণকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিসিক কাজ করে যাচ্ছে। জেলায় যারা শিল্প উদ্যোক্তা আছেন তাদেরকে বিসিক থেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঋণ এবং শিল্পকারখানা সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করে থাকে। যে সব উদ্যোক্তা আছেন আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে সর্বাত্মক সহযোগীতা করব।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে। সেই সাথে বেকারত্ব দূর হবে এমনটাই আশা করেন নওগাঁর সচেতনমহল।