Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী করোনেশন হল রক্ষায় সংবাদ সম্মেলন

এপ্রিল ২১, ২০১৭
অধিকার, নওগাঁ, সংবাদ সম্মেলন
No Comment

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি : নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড়ে ঐহিত্যবাহী শতবর্ষী করোনেশন হল ভেঙ্গে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে এমন অজুহাতে করোনেশন হল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। শতবর্ষী করোনেশন হল রক্ষা, সরকারি ভাবে হল তৈরী করা ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার দুপূরে মুক্তির মোড় এলাকায় একটি ভবনে ভবনে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শতবর্ষী করোনেশন হল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব রহমান রায়হান লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
শতবর্ষী করোনেশন হল রক্ষা আন্দোলন কমিটির আহবায়ক আলীমুর রেজা রানার সভাপতিত্বে এ সময় কমিটির উপদেষ্টা, প্রাক্তন অধ্যাপক, কবি ও সাহিত্যিক মআব সিদ্দিকী বাদাম, চরনের সংগঠক রতস সাহা রঘু, বাসদের (মার্ক্সবাদী) নওগাঁর সমন্বয়ক হবিবুর রহামান চৌধুরী, বাংলাদেশে ওয়াকার্স পার্টি নওগাঁর সংগঠক রামনাথ সরকার, একুশে উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব আতিক রহমান, নওগাঁর জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ নওগাঁর সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান চৌধুরী, জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদের চলচ্চিত্র ও আর্কাইভ বিষয়ক সম্পাদক আশীষ বিশ্বাস, বসুন্ধরা স্কুলের অধ্যক্ষ আতাউর রহামন বাবলু।
লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, একটি প্রভাবশালী মহল নওগাঁয় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী করোনেশান হল সোসাইটি ভেঙ্গে ওই স্থানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে এমন অজুহাতে হল ভাঙ্গার কাজ শুরু করেন। এর প্রতিবাদে গত ২০ ফেব্রæয়ারি সকালে করোনেশান হল সোসাইটি রক্ষা কমিটির উদ্যেগে শহরের মুক্তির মোড় ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন, লেখক ও কবি (প্রাক্তন) অধ্যাপক মআব সিদ্দিকী, মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক তারা, সদর উপজেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারন সম্পাদক আলিমুর রেজা রানা, জহির রায়হান চলচিত্র নওগাঁর সম্পাদক এর সাধারন সম্পাদক রহমান রায়হান। সে সময় বক্তারা বলেন, নওগাঁর ঐত্যিবাহী শতবছরের করোনেশান হল ভেঙ্গে না ফেলে তাকে রক্ষার দাবী জানান। এই হল ভেঙ্গে ফেলে কতিপয় স্বার্থনেশী মহল ফায়দা লুটবে এটা হতে দেয়া হবে না। মানববন্ধন শেষে হল রক্ষায় উর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টির জন্যে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। মানববন্ধনের সংবাদটি পরদিন দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন উদ্যেগ না নেয়ায় মহামান্য হাইকোর্ট একটি রির্ট করা হয়। গত ১৩ এপ্রিল ২০১৭ মহামান্য হাইকোর্ট নওগাঁ করোনেশন হল ভেঙ্গে মার্কেট নির্মাণে ৬ মাসের একটি নিষেধাজ্ঞা এবং শতবর্ষী এই প্রতিষ্ঠানকে কেন প্রতœতত্ব ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে একটি রুল জারী করেছেন। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্ববিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে। এতে নওগাঁবাসী আনন্দিত হয়েছে এবং নওগাঁর গণমানুষের দৃষ্টিভঙ্গি মত প্রতিফলিত ও সমর্থিত হয়েছে। অপরদিকে শতবর্ষী করোনেশন হল সোসাইটি একটি ঐতিহ্য তার যৌক্তিকতা আবারও প্রমাণ হয়েছে। এরপরও স্বার্থনেশী মহল ফায়দা লুটার জন্যে প্রতিদিন করোনেশন হল থেকে ইটসহ অন্যান্যে জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলছে।
সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সংস্কৃতি মন্ত্রীর কাছে করোনেশন হলটি তৈরির জন্য আবেদন এবং দ্রæত করোনেশন হল থেকে ইটসহ অন্যান্যে জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে না পারে এবং জাড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়াও নওগাঁবাসীর গণস্বাক্ষরসহ হলটির পূণঃস¤প্রসারিত ও আধুনিকভাবে নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও সংস্কৃতি মন্ত্রীর কাছে আবেদন পাঠানো প্রক্রিয়া চলছে বলে জানানো হয়।
জানা গেছে, ১৯১০ সালে লর্ড মিন্টোর বিদায়ের পর বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ১৯১১ সালে। এই সময় লর্ড হার্ডিঞ্জ বড় লাট হয়ে আসেন। এই সময়ে দিল্লীতে রাজা পঞ্চম জর্জ এর অভিষেক বা করোনেশন হয়। এই সময়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেন অমর গান- ‘জনগণ মন অধিনায়কও জয় হে’। এই সময় নওগাঁবাসী চাঁদা তুলে দিল্লীতে করোনেশনের জন্য টাকা পাঠায়। করোনেশনের একটি প্রভাব নওগাঁ শহরে ছড়িয়ে পড়ে। পাঠানো টাকার কিছু উদ্বৃত্ত অংশ থেকে যায়। এই সময় বাংলার বহু জায়গায় করোনেশন নামে ড্রামা থিয়েটার, স্কুল, ইন্সটিটিউট, হল গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে নওগাঁতেও ১৯১৬ সালে করোনেশন হল সোসাইটি গড়ে ওঠে। তারও পরে ১৯১৭ সালে করোনেশন স্কুল গড়ে ওঠে। উদ্বৃত্ত টাকাসহ করোনেশন হল গড়ে উঠেছিল যাঁদের সার্বিক সহযোগিতায় তাদের মধ্যে বিশিষ্টজন মানব দরদী কিশোরী মোহন সান্যাল (পার-নওগাঁ), রজনী কান্ত রায় চৌধুরী, সুরেশ চন্দ্র রায় চৌধুরী, প্রমথনাথ বাগচী (উকিল পাড়া), সতীশ চন্দ্র মোক্তার, প্রভাষ চন্দ্র বাগচী (উকিল পাড়া), শিরিশ কুমার সান্যাল (পার নওগাঁ), সুরেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত, শুভাশীষ মোহন সরকার, যোগেশ চন্দ্র, কুমুদনাথ ভট্টাচার্য্য, উপেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, সুরেন্দ্রনাথ দাস গুপ্ত, সুরেন্দ্র মোহন সাহা, সতীশ চন্দ্র সাহা সহ প্রমূখের উদ্যোগে এই রঙ্গমঞ্চ ও রঙ্গালয় হলটি নির্মিত হয়। এ সম্পর্কে আরো জানা যায়, সুরেন্দ্রনাথ সিংহ ও কাজী ইউসুফ আলী করোনেশন হলের জন্য ৩৬ শতাংশ জমি ক্রয় করে দেন।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মহাত্মা গান্ধীজী, নাট্য দিকপাল অহীন্দ্র চৌধুরী, ইতিহাসবিদ নীহার রঞ্জন রায়, সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশি, সাহিত্যিক খগেন্দ্রনাথ মিত্র, বিজয় লাল চট্টোপাধ্যায়, তারা শংকর বন্দোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়ীত এই করোনেশন হল।
স¤প্রতি সময়ে হলটি ভাঙ্গার মাত্র ১ সপ্তাহ পূর্বে ৭ মার্চ থেকে ১২ মার্চ’২০১৭ খ্রি: বন্ধু’৮৪ নওগাঁর আয়োজনে একটি সফল নাট্যউৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। যে উৎসবে দেশের সুনামধন্য নাট্যদল আরণ্যক, ঢাকা থিয়েটার, প্রাচ্যনাট, ঢাকা থিয়েটার আর্ট ইউনিট সহ স্থানীয় নাট্যদল গুলো নাটক মঞ্চায়ন করেন। যে নাটকগুলো মঞ্চায়নের পর দর্শক নন্দিত হয়ে নাট্যজন মামুনুর রশীদ, আজাদ আবুল কালাম, শহীদুজ্জামান সেলিম, আব্দুল বারী প্রমূখরা এই শতবর্ষী ঐতিহ্য নাট্যমন্দিরকে বাঁচানোর আকুল আবেদন জানান। নাট্যজন মামুনুর রশীদের আবেগ মিশ্রিত অশ্রæজল কণ্ঠে আকুতি জানানোর সময়ে উৎসবের উদ্বোধক সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী, আরেক দর্শক প্রিয় অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর এমপিসহ জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার, জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমানসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান জানান, ঐতিহ্যবাহী করোনেশন হল কে বা কাহার ভাঙ্গছেন এবং কারা মহামান্য হাইকোর্ট রির্ট করেছেন কেউ তাকে জানান নি। তবে তিনি শুনেছেন মহামান্য হাইকোর্ট নওগাঁ করোনেশন হল ভেঙ্গে মার্কেট নির্মাণে ৬ মাসের একটি নিষেধাজ্ঞা এবং শতবর্ষী এই প্রতিষ্ঠানকে কেন প্রতœতত্ত¡ ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে একটি রুল জারী হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোন কাগজপত্র হাতে পাইনি। হাতের কাগজপত্র পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জেলা প্রশাসক জানান।