Pages

Categories

Search

আজ- মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ঠাকুরগাঁও সীমান্তে দুই বাংলার মিলন মেলা, কাঁটাতার আলাদা করতে পারেনি নাড়ীর টান

ডিসেম্বর ৪, ২০১৫
ঠাকুরগাঁও
No Comment

thakurgaon_61504ভারত ও বাংলাদেশ দুটি দেশের ভৌগলিক সীমারেখা আলাদা করা হয়েছে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে। কিন্তু সে কাঁটাতার আলাদা করতে পারেনি দুই দেশের মানুষের ভালবাসার টান। সুযোগ পেলেই এ টানেই তারা ছুটে যান সীমান্তবর্তী কাঁটাতারের বেড়ার কাছে। মিশে যান তারা একে অন্যের সঙ্গে। পেতে চান মায়া-মমতা, আর স্বজনদের সান্নিধ্য। দীর্ঘদিন পর একে অপরে মিলিত হয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। বিনিময় করেন মনের জমানো হাজারো না-বলা কথা।

শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার নাগর নদের পারে কোচল এবং চাপাসাড় সীমান্তে বসেছিলো দুই বাংলার মানুষের মিলন মেলা। সংক্ষিপ্ত সময়ের হলেও দীর্ঘদিন পর দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ স্বজনদের সাথে মিলিত হয়ে বিদায়ের সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন অনেকেই।

এলাকাবাসী জানায়, দেশ বিভাগের পর থেকে হরিপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী গোবিন্দপুরে পাথর কালির মেলা উপলক্ষ্যে কিছু সময়ের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিতো ভারত। কোন বাঁধা ছাড়াই দুই বাংলার মানুষ আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে পারতো। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সেসময় কাঁটাতারের বেড়ার কাছে যেতে দিতো বাংলাদেশীদের। আর এ সুযোগে নাড়ির টানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষগুলো কাঁটাতারের বেড়ার দুইধারে দাঁড়িয়ে সহজেই দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা- বার্তা সেরে নিয়ে ফিরে যেতো স্ব স্ব বাড়িতে। আর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এ ব্যবস্থা করে দিতেন দুই বাংলার জনপ্রতিনিধিরা।

শুক্রবার ভোর থেকে প্রচন্ড ঠান্ডা উপেক্ষা করে হাজার হাজার বাংলাদেশের মানুষ ভারতীয় আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে ভীড় করে হরিপুর উপজেলার নাগর নদের পারে কোচল এবং চাপাসাড় সীমান্তে। সেখানে বসেছে বিভিন্ন অস্থায়ী খাবারের দোকান। কেউ কেউ বাড়ি থেকে খাবার রান্না করে এনেছেন।  অপেক্ষা করছেন কখন বিএসএফের অনুমতি মিলবে, দেখতে পাবেন বহুদিন না দেখা স্বজনদের মুখ। চলছে নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা। কখন অনুমতি দিবে বিএসএফ।

সকাল ৯টার দিকে দুই বাংলার মিলন মেলার অনুমতি দেয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই মিলন মেলায় দুই বাংলার হাজারো মানুষ মিলিত হয়ে সেরে নেয় তাদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাত। ফিরে আসার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন অনেকে।

বগুড়া থেকে এসেছেন বৃদ্ধা করুনা রানী (৬০)। তিনি সকল বাঁধা উপেক্ষা করে মেয়ে কমলার সঙ্গে দেখা করতে উপস্থিত হন কাঁটাতারের বেড়ার পাশে। হাত বাড়িয়ে দেন মেয়ের দিকে। মিনিট দশেক কথা বলেন তিনি। হাতের একটি ব্যাগ ছুঁড়ে দেন মেয়ের দিকে।

তার সঙ্গে থাকা বিপাশা রানী জানান, বিশ বছর আগে বাসন্তীর মেয়েদের বিয়ে হয় ভারতের খুরকা গ্রামে। বছরে এই একটা দিন অধির আগ্রহে থাকি দুই মেয়েকে দেখার জন্য। নাতির জন্য একটি কাপড় এনেছেন। এই বয়সে কেন সীমান্তে এসেছেন জানতে চাইলে বাসন্তী রানী জানান, শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। কখন মারা যাবো কে জানে। তাই মেয়ে ও জামাইকে দেখতে এসেছি ।

অঞ্জলী রানী (৪২) এসেছেন ভারতের কাকরমনি গ্রামে থাকা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি জানান, বিয়ের পর এই প্রথম মাকে দেখলাম । তবে তেমন কথা হয়নি। অসুস্থ মা কবে মারা যায় কে জানে! তাই মাকে এক নজর দেখে এলাম। এখন একটু শান্তি লাগছে।

সদর উপজেলার রায়পুর থেকে মেয়েকে দেখতে গিয়েছিলেন নরেন্দ্র রায় (৭৫)। তিনি জানান, নয় বছর ধরে মেয়ের সঙ্গে দেখা নেই। গতবার চেষ্টা করেও দেখা হয়নি। মেয়ে ও জামাইয়ের জন্য পোলাও রান্না করে এনেছিলাম।

হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম বলেন, হরিপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকা পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির আগে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অধীনে ছিল। এ কারনে দেশ বিভাগের পর আত্মীয় স্বজনেরা দুই দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাই সারা বছর এদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে পারেনা। অপেক্ষা করে থাকেন পাথর কালির মেলার জন্য।