Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ১৪ নভেম্বর ২০১৮

জামায়াত নিষিদ্ধে আইন সংশোধন হচ্ছে

নভেম্বর ২৫, ২০১৫
রাজনীতি
No Comment

bangladesh-jamaat-e-islamiনির্বাহী আদেশে নয়, আইন করে আদালতের আদেশের মাধ্যমেই জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করতে চায় সরকার। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে দল বা সংগঠনের মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তির ব্যাপারে কিছু বলা নেই। তাই আইনটি সংশোধন করেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হবে।

এর আগে নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে। এ কারণে দলটি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।

এদিকে জামায়াত ও এর মতাদর্শে পরিচালিত সব সংগঠন নিষিদ্ধ করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত বছরের ২৭ মার্চ তদন্ত শেষ করে প্রসিকিউশনের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তা প্রধান প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর কাছে রয়েছে। কিন্তু আইন সংশোধন না হওয়ায় মামলা করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ আইনের সংশোধনীর খসড়া এখন মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক।
মন্ত্রী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিসভা কমিটিতে আইনের সংশোধনীর খসড়া জমা দেওয়া আছে। শিগগিরই বৈঠকে তোলা হবে বলে আশা করি। শুধু জামায়াত নয়, ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যেসব দল জড়িত ছিল, সব কটিকে নিষিদ্ধ করতে এই আইনের খসড়া গত বছরই করা হয়।’

সংশোধনীটি মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত হলে তা অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে। সংসদ সংশোধনী পাস করলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের বিচারে আইনগত কোনো বাধা থাকবে না।

এক বছর ধরে তদন্তের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র এবং এসব অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগ-এই মোট সাতটি অভিযোগে জামায়াতের বিচার করা যায়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী, তাদের সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা দিতে গঠিত শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী এবং জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৪(১) ও ৪(২) ধারায় অপরাধ করেছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘এসব অভিযুক্ত সংগঠনসমূহের নীতি, নীতিনির্ধারক, সংগঠক, পরিচালক এবং সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মী সকলেই উল্লেখিত অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী।’ ট্রাইব্যুনালে এ মামলা পরিচালনার জন্য প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে প্রধান সমন্বয়কারী করে একটি টিমও গঠন করা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, জামায়াত নিষিদ্ধের জন্য মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও নিয়ে রাখা আছে। আইন সংশোধনের পরই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত এবং এই দলের আদর্শ ও ভাবধারায় পরিচালিত সব সংগঠন নিষিদ্ধের দাবি জানানো হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে শুধু জামায়াতে ইসলামীই নিষিদ্ধ হবে না, এ দলটির আদর্শ বাস্তবায়নে ভিন্ন নামে কোনো সংগঠনও বাংলাদেশে করা যাবে না। জানা গেছে, দেশ-বিদেশ থেকে জামায়াতের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখন তদন্ত সংস্থার হাতে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মূল দলসহ শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও ইসলামী ছাত্রসংঘ জামায়াতি আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটন করেছে-এমন অভিযোগ আনা হবে মামলায়।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এ পর্যন্ত যাদের বিচার শেষ হয়েছে, সবার রায়ে জামায়াতসহ এই ভাবধারার দলগুলোর ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে একই ধরনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

এসব রায়ে বলা হয়, পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটি গঠন করে। আর এসব বাহিনী গঠনে জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তান রক্ষার নামে তারা সশস্ত্র সহযোগী বাহিনী গঠন করে নিরস্ত্র বাঙালি, হিন্দু সম্প্রদায়, বুদ্ধিজীবী, আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতার সপক্ষের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য যুদ্ধ করে। যখন গোটা পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকরা স্বাধীনতাযুদ্ধের সমর্থন করছিল ও অংশ নিচ্ছিল, সে সময় কিছু বাঙালি, বিহারি, জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্রসংগঠন এর বিরোধিতা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে যোগ দেয়। এ কারণেই মাত্র ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালি শহীদ হয়, প্রায় চার লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়। প্রায় এক কোটি মানুষ দেশান্তরিত হয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়।

রায়ে আরো বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে পাকিস্তান সরকার বাঙালি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অফিসারদের নিরস্ত্র করার জন্য এবং নিরীহ জাতীয়তাবাদী বাঙালি রাজনীতিক, সেনা কর্মকর্তা, সৈন্য, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের হত্যা শুরু করে। এ কাজে তারা স্থানীয় দালাল তথা রাজাকার, আলবদর ও জামায়াতে ইসলামীর সহযোগিতা নেয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি কিংবা সশস্ত্র, প্রতিরক্ষা কিংবা সহায়ক দল বা বাহিনীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে এই আইন কার্যকর হওয়ার আগে বা পরে হোক না কেন, ৩(২) ধারা মোতাবেক কোনো অপরাধ করে থাকলে তার বিচার করার বা শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের থাকবে।

৩(২) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধের কথা বলা হয়েছে। এই ধারায় আরো বলা হয়েছে, ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন কর্তৃক নির্দিষ্ট মানবকল্যাণকর বিধিসমূহ, যা সশস্ত্র সংঘাতে ভঙ্গ করা হয় তাই-ই অপরাধ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ২(এ) ধারায় সহায়ক বাহিনীর একটি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, দল বা সহায়ক বাহিনীসমূহ-এর অন্তর্গত বোঝাবে সক্রিয়, প্রশাসনিক, সংরক্ষিত দল ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত দলকে।

জামায়াতে ইসলামী একটি দল, যা ব্যক্তিসমষ্টি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। এরা দলীয়ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। দেশের নিরীহ মানুষের শান্তি বিনষ্ট করতে মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা ধ্বংসাত্মক কাজে সরাসরি অংশ নিয়েছে বলে অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে জন্য দলগতভাবে জামায়াতে ইসলামী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। তবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ না আনলেও সাক্ষীদের বক্তব্য ও দালিলিক প্রমাণে জামায়াত মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে-এটা প্রমাণিত হয়েছে। এখন যদি ট্রাইব্যুনালের সামনে সরকার অভিযোগ আনে তবে ট্রাইব্যুনাল দলগতভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ আমলে নিতে পারেন। এ জন্য আইনে সুনির্দিষ্টভাবে শাস্তির বিধান থাকতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করার রায়কে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে সরকার, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষ জামায়াতের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে। আর ট্রাইব্যুনালের সামনে জামায়াতে ইসলামী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে ট্রাইব্যুনাল বিচার করবেন। সে জন্য আইন সংশোধন করতে হবে।

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ‘আমাদের কাছে যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল, তা এখন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে রয়েছে।’ তিনি বলেন, সরকার আইন সংশোধন করতে যাচ্ছে। এ সংশোধনীর পরই বলা যাবে কোন প্রক্রিয়ায় বিচার হবে।

সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোনো দল গঠিত হলে, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী, পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করলে, রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কার্য পরিচালনা করলে সংগঠন করার অধিকার থাকবে না।