Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ২১ নভেম্বর ২০১৮

গাজীপুরে কারখানায় বয়লার বিস্ফোরন, ১৩জন নিহত, লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর নিহতদের পরিবার প্রতি ৮লাখ টাকা সাহায্যের ঘোষনা


মঞ্জুর হোসেন মিলন: গাজীপুরের কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকায় সোমবার সন্ধ্যায় মাল্টিফ্যাবস লিমিটেড নামক তৈরি পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ স্থল থেকে নিখোঁজ আরও ৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে ১৩ জনে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। বয়লার বিস্ফোরণের পর কারখানার চারতলা ভবনের দুতলা পর্যন্ত এক পাশের অংশ ধসে পড়েছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহতদের পরিবার প্রতি আটলক্ষ টাকা দেওয়ার ঘোষনা।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু মঙ্গলবার সকালে কাশিমপুর নয়াপাড়ায় অবস্থিত দুর্ঘটনা কবলিত মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেড কারখানাটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি জানান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবার প্রতি দুইলক্ষ টাকা, ইন্সুরেন্স কোম্পানীর পক্ষ থেকে তিন লক্ষ টাকা এবং কারখানা কতৃপক্ষের পক্ষ থেকে তিনলক্ষ টাক এই মোট আট লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে।

এলাকাবাসী, ফায়ার সার্ভিস, কারখানার শ্রমিক ও কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকার মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেড নামে তৈরি পোশাক কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। ওই পোশাক কারখানাটি ঈদের পর মঙ্গলবার খোলার কথা ছিল। এজন্য সোমবার থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিল কতৃপক্ষ। দুপুরের পর ডাইং ইউনিটের বয়লার সেকশনটি চালু করা হয়। এতে শতাধিক লোক কাজ করছিলেন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে বিকট শব্দে ওই পোশাক কারখানার নিচতলায় বয়লার বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরনে চারতলা ভবনের নিচতলা ও দোতলার দুইপাশের দেয়াল, দরজা জানালা এবং যন্ত্রাংশ উড়ে বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। এতে কারখানার শ্রমিক ছাড়াও সামনের রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী লোকজনও আহত হন। বয়লার বিস্ফোরণ হওয়ার পর কারখানার চারতলা ভবনের দোতলা পর্যন্ত এক পাশের অংশ ধ্বসে পড়েছে। ধ্বসে পড়া কক্ষগুলোতে কাঁচামাল ও মেশিনারিজ ছিল। এছাড়া সন্ধ্যায় কারখানা ছুটি হওয়ায় ভেতরেও খুব বেশি শ্রমিক ছিলেন না। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর, জয়দেবপুর, সাভারে ইপিজেড, কালিয়াকৈর ও টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা পৌণে আটটার দিকে ঘটস্থলে পৌছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে স্থানীয় লোকজনও উদ্ধার তৎপরতা চালায়। এ ঘটনায় দশজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ও ক্লিনিকে পাঠানো হয়।
মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পুনরায় উদ্ধারকাজ শুরু করেছে ফায়ার সার্ভিস। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজ পরিদর্শক শাহিন মিয়া বলেন, উদ্ধারকাজ শুরু হওয়ার পরপরই একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় মন্ডল গার্মেন্টেসের সুইং অপারেটর আল আমিন জানান, কারখানার পাশেই মাগরিবের নামাজ পড়ার সময় একটি বিকট শব্দে বয়লার বিস্ফোরণ হয়। এসময় কারখানার নিচ তলায় আগুন লেগে যায়। আগুনে কারখানার কিছু অংশ ধসে গেছে। স্থানীয় জাহিদ হোসেন, সুমন মিয়া, কাওসার হোসেন জানান, প্রচন্ড শব্দে বয়লার বিস্ফোরণ হয়। এতে কারখানাটির ছাদের একটি অংশ বসে যায়।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারি পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ওই কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ হওয়ার পর কারখানার চার তলা ভবনের দুতলা পর্যন্ত একপাশের অংশ ধসে পড়েছে। সদর দপ্তর, সাভার ইপিজেড, জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর ও টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালান। ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা কারখানার লোকজন ও এলাকাবাসীর সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে পাঠানো হয়।

স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর ঃ
ওই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৯জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরা হলেন, মাগুরার শালিখা থানার গোবরা গ্রামের আইয়ুর আলী সর্দারের ছেলে কারখানার ফায়ারম্যান আল আমিন হোসেন (৩০), বাক্ষণবাড়িয়ার নাসিরনগর থানার কুন্ডা গ্রামের সাগর আলী মীরের ছেলে কারখানার সহকারি ইঞ্জিনিয়ার মুজিবুর রহমান, রাজবাড়ির গোয়ালন্দ থানার চরকাসনন্দ এলাকার মনিন্দ্র নাথের ছেলে বিপ্লব চন্দ্র শীল, বগুড়ার সোনাতলা থানার নামাজখালি গ্রামের শাহার আলীর ছেলে কারখানার বয়লার অপারেটর মাহবুবুর রহমান, চট্টগ্রামের মীরসরাই থানার ববনসুন্দর গ্রামের কারখানার বয়লার ইনচার্জ আব্দুস ছালাম, একই থানার কাউছড়া এলাকার লুৎফুল হকের ছেলে মনসুরুল হক (৪০), নওগা সদর উপজেলার চকরামপুর এলাকার মৃত আমিনুল হকের ছেলে আমিরুজ্জামান, নূরুল মোস্তফা চৌধুরীর ছেলে আশরাফ হোসেন চৌধুরী এবং চাঁদপুরের সদরের মদনা গ্রামের বাচ্চু ছৈয়ালের ছেলে গিয়াস উদ্দিন ছৈয়াল।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (রাজস্ব ও এল.এ) মাহমুদ হাসান জানান, ওই দূর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ১০জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে ৯জনের লাশ এবং ঢামেক হাসপাতাল থেকে একজনের লাশ হস্তান্তর করা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রতি পরিবারকে লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে। লাশ কারখানা কতৃপক্ষ এবং নিহতদের স্বজনরা সনাক্ত করেছেন।

ঘটনা তদন্তে দুই কমিটি,
কারখানার বয়লার বিস্ফোরণের পর গাজীপুরের জেলা প্রশাসক দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হানুল ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে সময় বেধে দেয়া হয়েছে। কমিটির প্রধান রায়হানুল ইসলাম জানান, আমরা সাতটি কারন সামনে রেখে তদন্ত কাজ শুরু করেছি। “তদন্তের শুরুতে কাগজপত্র দেখে জানতে পেরেছি, ওই বয়লারটির নবায়ন করার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৪ জুন ২০১৭”। তবে এ জন্যই যে বয়লারটি বিস্ফোরিত হয়েছে তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, জেলা পুলিশ, শিল্পপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বয়লার পরিদর্শক, কলকারখানা পরিদপ্তর, বিজিএমই এবং সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তা। এ কমিটিকে বিস্ফোরনের কারন অনুসন্ধান,দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দূর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।

অপরদিকে ফায়ার ও সিভিল ডিফেন্সের সদর দপ্তরের স্টেশন অফিসার মো. আতাউর রহমান জানান, ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠণ করা হয়েছে। যার প্রধান হলেন- ফায়ার ও সিভিল ডিফেন্সের (ঢাকা) সহকারি পরিচালক দীলিপ কুমার ঘোষ। সাত কার্যদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। দীলিপ কুমার ঘোষ জানান মঙ্গলবার সকালে তদন্তকাজ শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে মাল্টিফ্যাবস লিমিটেড পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় এখনো তিনজন নিখোঁজ রয়েছে।
কারখানার সামনে জেলা প্রশাসন স্থাপিত কন্ট্রোল রুম সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবার রাতে মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেড নামে একটি পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় ওই এলাকার ১২টি কারখানায় মঙ্গলবার ছুটি ঘোষাণা করা হয়েছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল খালেক জানান, সোমবার রাতে দুর্ঘনার পর মঙ্গলবার সকালে মাল্টি ফ্যাবস কর্তৃপক্ষ তাদের কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে ফটকে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে। ওই কারখানার পাশের কটন ক্লাব, ইসলাম নীট ওয়্যার, আলিম ফ্যাশন লিমিটেড, ডেল্টা ফ্যাশন, মাস্কো লিমিটেডসহ ১২টি কারখানা মঙ্গলবারের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।