Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কালিয়াকৈরে স্কুল কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের ভানমতি খেলা


আলমগীর হোসেন, কালিয়াকৈর : “ভাউমান টালাবহ মডেল হাইস্কুল”। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার অর্ন্তরগত সূত্রাপুর ইউনিয়নে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুল এটি। অত্র বিদ্যালয়টি তার দীর্ঘ দিনের সুনাম আর ঐতিহ্যকে ধারণবাহন করে বহুপথ অতিক্রম করে ভালই চলে আসছিল। কিন্তু চলতি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোঃ মনিরুজ্জামান এবং প্রধান শিক্ষক মোঃ হারেজ উদ্দিনের শিক্ষাঙ্গন বিরোধী অনৈতিক কিছু কার্যক্রলাপের দরুন বিদ্যালয়টি তার দীর্ঘ দিনের সুনাম আর ঐতিহ্যকে হারাতে বসেছে। একের পর এক অনিয়ম আর দূর্নীতি যেন গ্রাস করে নিচ্ছে বিদ্যালয়টিকে।
অনুসন্ধানে জানাযায়, গত বছরের ২১শে এপ্রিল ২০১৬ সালে সাধারন অভিভাবকদের ভোটের মাধ্যমে গঠিত হয় ১১ সদস্যের স্কুল ম্যানেজিং কমিটি। যার সভাপতি নির্বাচিত হন সূত্রাপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক মোঃ মনিরুজ্জামান এবং সর্বাধিক অভিভাবকের ভোটে নির্বাচিত অভিভাবক সদস্য হন মোঃ সানোয়ার হোসেন। সদস্য সচিব নির্বাচিত হন অত্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারেজ আলী। কমিটিতে অন্য আরো আট জন সদস্য রয়েছেন।
পরবর্তীতে এই কমিটির তিনজন সদস্যকে নিয়ে গঠন করা হয় বিদ্যালয় অডিট কমিটি এবং পার্সেস কমিটি। সভায় সর্ব সম্মতিক্রমে মোঃ সানোয়ার হোসেনকে প্রধান করে ওই দুটি কমিটি গঠন করা হয়। চলতে থাকে এই কমিটির কার্যক্রম। কিছুদিন অতিবাহিত হতে না হতেই শুরু হয় নানা অনিয়ম ও দূর্নীতি। চলতি বছর (২০১৭) সালের গত এসএসসি পরিক্ষার সময় পরিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বোর্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। কয়েকজন ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের অভিযোগ থেকে জানাযায়, অত্র স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ হারেজ আলী ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে ফরম-ফিলাপ বাবদ মাথা পিছু ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা করে আদায় করে থাকে।
এব্যাপারে কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীর অভিভাবকরা কালিয়াকৈর থানা শিক্ষা অফিস, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব ও শিক্ষা মন্ত্রালয়ের মাননীয় মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
বিষয়টি জানার পর কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় রিপোর্টটি ছাপা হয়।


এঘটনায় সাধারন অভিভাবকদের পক্ষে অবস্থান করেন অত্র বিদ্যালয়ের ১নং অভিভাবক সদস্য মোঃ সানোয়ার হোসেন। অনিয়ম আর বিভিন্ন দূর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারন অভিভাবকরা সানোয়ার হোসেনকে সাথে নিয়েই অত্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের এ ধরনের কার্যক্রলাপের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট বিচার প্রার্থনা করেন।
এলাকার সাধারন কৃষক ও গরীব লোকদের সন্তানের কাছ থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায়কে অন্যায় অবিচার বলে উল্লেখ করে তাকে বিচারের আওতায় আনার জন্য দাবী জানান এবং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব অবহেলার কারনেই এটি ঘটছে বলে মনে করেন এলাকার সচেতন মহল। সেই সাথে অভিভাবক সানোয়ার হোসেন সাধারন অভিভাবক ও সচেতন মহলের সাথে একমত পোষন করে প্রধান শিক্ষকের এহেন কর্মের বিচার দাবি করেন।
একপর্যায়ে সভাপতি, প্রধান শিক্ষক ও কমিটির অন্য সদস্য আলমগীর হোসেন মিলে সানোয়ার হোসেনের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে নানা ভাবে স্কুল কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়ার পায়তারা শুরু করে। এর পর থেকে বিভিন্ন ভাবেই সানোয়ার হোসেনকে তারা হুমকি-ধামকি এবং মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার কথা বলে আসছিল।
পরে সানোয়ার হোসেন কোন উপায় না পেয়ে ইংরেজী ১১/০২/২০১৭ইং তারিখ কালিয়াকৈর থানায় উপস্থিত হইয়ে একটি সাধারন ডায়রী (নং ৮৯৯) দায়ের করেন। যেখানে বিদ্যালয়ের সভাপতি, প্রধান শিক্ষক ও কমিটির সদস্য আলমগীর এর বিরুদ্ধে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে অনিয়ম করে টাকা আদায় এবং বিভিন্ন সময় সানোয়ার হোসেনকে হুমকি-ধামকি এবং মামলা দিয়ে ফাসিয়ে দেওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়। পরে ওই অভিযোগের ভিত্তিতে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষককে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়।
এর পর থেকেই সানোয়ার হোসেনের প্রতি বিদ্যালয়ের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের মধ্যে মনমাণিন্য বিষয়টি চলতে থাকে।
এরই একপর্যায়ে এসে গত ০৯/১০/২০১৭ইং তারিখ সানোয়ারের বিরুদ্ধে একটি মানববন্ধন করা হয়। যেখানে লেখা হয়েছে “দুস্কৃতকারী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও কুলাঙ্গার সানোয়ার হোসেনের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন”। এছাড়াও আরো লেখা হয়েছে ভাউমান টালাবহ হাই স্কুলের সকল শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মন্ডলী। সাধারন শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সম্পর্কে না বুঝে ব্যানার নিয়ে দারালেও ওই স্কুলের কোন শিক্ষকই ওই দিন ওই ব্যানারতো দুরের কথা মানববন্ধনেই দাড়াননি।
মানববন্ধনের বিষয়টি জানতে কথা হয় সূত্রাপুর ইউপির ৮নং ওয়ার্ড মেম্বার মোঃ রনির সাথে তিনি জানান, মানববন্ধনের কথাটি শুনার পর আমি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ফোন দেই এবং তাকে বলি আমার ওয়ার্ডে এই স্কুল। এখানে এতো বড় ঘটনা আমাকে একটু অবগত করতেন আমিও আপনাদের সাথে থেকে যেভাবে বিষয়টির সমাধান করা যায় করতাম। হুট করে স্কুলে এটি করা কি ঠিক হলো বলতেই প্রধান শিক্ষক বলেন আমি এব্যাপারে কিছুই জানি না।
সানোয়ার সম্পর্কে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে দুস্কৃতকারী, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ লেখাটা মনে হয় ঠিক হয় নাই। কারন আমি যতদিন ধরে তাকে চিনি তিনি এমন লোক না। তার এমন রেকর্ট আমার জানা মতে নেই।
এব্যাপারে স্থানীয় ব্যক্তি হাজ্বী মোঃ ফজল হক জানান, মানববন্ধনের ব্যানারে যেসব কথা লেখা হয়েছে তার একটাও সত্য না। আপনারে শুধু একটা কথাই বলতে চাই যে, সানোয়ার হোসেনকে স্থানীয় ছাত্র-ছাত্রীর অভিভাবকরা স্কুল ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে একবার নয় দু‘দুবার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। যেখানে তিনি প্রথমবার ২য় স্থান এবং এবার ১ম স্থান অর্জন করে। শুধু তাই নয় নির্বাচনে ৬জন প্রতিদন্দির মধ্যে অন্য ৫জনের সমান তিনি একাই বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। আর কি বলব সে ভাল লোক না হলে এলাকার সবাই তাকে ভোট দিয়ে পাশ করাই। তই আমি যেটুকু ধারনা করছি যে কিছুদিন আগে সানোয়ার হোসেন থানায় একটি অভিযোগ দিলে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষককে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে ছিল। সেই ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা থেকে এটা হতে পারে।
ভাউমান এলাকার সাধারন কৃষক পরিমল চন্দ্র জানান, আমার জানা মতে সানোয়ার এতো খারাপ লোক না। কেউ যদি তাকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ বলে থাকে মিথ্যা কথা বলেছে। আমি তার ব্যাপারে এমনটা কখনো শুনিনি।
এব্যাপারে ৭০ বছর বয়সের হাজ্বী মারফত আলী জানান, সানোয়ার সম্পর্কে সন্ত্রাস চাঁদাবাজ কথাটা ঠিক না। যাইহোক আমার জানামতে সানোয়ার এতো খারাপ না। আমি এমন কোন বিষয় আগে তার সম্পর্কে শুনিনি। আমি এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছি চশমা ছাড়া বেশি দেখি না। আমার বয়স ৭০ বছর প্রায়। আমি শুনছি মাষ্টারগো সাথে ওর কি জানি হয়ছে।
নাম প্রকাশ না করার সর্তে অত্র কমিটির একজন সদস্য জানান, আমাদের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের দায়ে কিছু অভিযোগ রয়েছে কথাটা সত্য। আমার জানা মতে কয়েকজন অভিভাবক তার বিরুদ্ধে অনিয়মের দায়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। এছাড়া এই কমিটি গঠন হওয়ার পরই গ্রæপিং শুরু হয়ে যাওয়ার কারনে আমার এ কমিটির প্রতি অনিহা সৃষ্টি হয়ে গেছে। আমি কয়েক মাস যাবৎ স্কুলে যাই না। আর এক সদস্য আছে যে প্রায় একবছর হল গ্রæপিং এর কারনে স্কুলে আসেনই না। সানোয়ার হোসেনের ব্যাপারে তিনি বলেন সে একজন ভাল লোক। আমি তার সম্পর্কে খারাপ কিছু দেখি নাই। তবে এটা বলব কমিটির মধ্যে গ্রæপিং করা ঠিক হয় নাই। আর খারাপের পাল্লাটা বড় করেই গ্রæপিংটা করা হয়েছে। যার কারনে সৎ আর ন্যায়নীতি পরায়ন ব্যক্তিরা এ কমিটিতে থেকে কোন কাজ করতে পারছে না। তাদেরকে বিভিন্ন অজুহাতে দুরে রেখেই স্বার্থসিদ্ধি উদ্ধার করছে অন্যরা।
এবিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক হারেজ আলীকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, মানববন্ধনের ব্যানারটি ছাত্র-ছাত্রীরা করেছে এব্যাপারে আমি কিছু জানিনা। সানোয়ার হোসেন যে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ তার কাছে কোন প্রকার প্রমান আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন আমার কাছে দেখানোর মতো কোন প্রমান নেই। তবে সানোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে আমরা তা উপজেলা শিক্ষা অফিসে এবং সাংবাদিকদের কাছে দিয়েছি।
স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো মনিরুজ্জামান জানান, সানোয়ার হোসেন স্কুল ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে অভিভাবকদের সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে ১নং অভিভাবক সদস্য নির্বাচিত হন। কমিটি গঠন করার প্রথম কিছুদিন ভালই ছিল। কিন্তু বর্তমানে তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। সে স্কুলের শিক্ষিকাদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে। যার কারনে ছাত্র-ছাত্রীরা এ মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে।
এঘটনায় সানোয়ার হোসেন জানান, আমি এর আগের কমিটিতেও ছিলাম স্কুলের জন্য আমি কি করেছি তা সকল অভিভাবকরা দেখেছেন যার কারনে এবারও সবাই ভোট দিয়ে আমাকে ১ম স্থান করে নির্বাচিত করেছেন। যে অভিভাবকরা আমাকে এতো মর্যদা দিয়ে এই কমিটিতে স্থান করে দিল। আমি তাদের দেওয়া সেই সম্মানটা রক্ষা করেই কাজ করে আসছিলাম। তাদের পাশে থেকে অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করছিলাম এটাই হয়তো আমার অন্যায়। আর এর জন্য যদি আমাকে ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয় দুঃখ করা ছাড়া আমার কিছু করার নেই।