Pages

Categories

Search

আজ- বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে পিকনিক কর্ণার সহ ১৮ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলছে

Capture

এমদাদুল হক দুলু, বদলগাছী (নওগাঁ) থেকেঃ হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে আরো দর্শনশীল গড়ে তুলতে পিকনিক কর্ণারসহ চলছে ১৮কোটি টাকার সংষ্কার, সংরক্ষন ও উন্নয়ন মূলক কাজ। ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে ১০ কোটি টাকার উন্নয়নমুলক কাজ। এর মধ্যে রয়েছে সৌন্দর্য বর্ধনশীল ও আকর্ষনীয় মূল প্রবেশদ্বার। প্রবেশ দ্বারের দক্ষিন পার্শ্বের কক্ষে প্রত্ম সামগ্রী ও বই পত্র কিনতে পাওয়া যাবে। উত্তর পার্শ্বে থাকবে টিকিট কাউন্টার রয়েছে মহিলা টয়লেট ও পুরুষ টয়লেট। নির্মান করা হয়েছে ১টি মসজিদ। অফিসার্স কোয়ার্টার ব্যাটিলিয়ানদের জন্য রয়েছে আনসার কোয়ার্টার, স্টাফ কোয়ার্টার নির্মান করা হয়েছে। ১০টি দর্শনার্থী ছাউনী রয়েছে এর মধ্যে ২টিতে ছাউনী দেওয়া হয়নি। এই ছাউনী গুলিতে পিকনিক সহ দর্শনার্থীরা বসে বিশ্রাম নিতে পারবে। দর্শনার্থীর ছাউনিগুলোর পার্শ্বেই রয়েছে পুরাতন আদলে নির্মিত ১টি পুকুর। এছাড়া পাথওয়ের মাঝে রয়েছে একটি বসার স্থান। মনোরোম পরিবেশে নির্মাণ করা হয়েছে পাথওয়ে। রয়েছে গাড়ী পার্কিং এর জায়গা। সাউথ এশিয়া টুরিজম ইনফ্র্যাস্ট্রাকচার ডেভলপমেন্ট প্রজেক্টের অধীনে ১০কোটি টাকার কাজ ব্যস্তবায়ন করা হয়েছে। একই প্রকল্পের অধীনে আরো ৮কোটি টাকার উন্নয়নমুলক ও সংষ্কার কাজ চলমান রয়েছে । এর মধ্যে পিকনিক কর্নার থেকে সরাসরি বৌদ্ধ মন্দির প্রবেশ পথে নির্মান করা হচ্ছে ১টি ব্রিজ। বৌদ্ধ মন্দিরের প্রধান ফটক সহ ভিতরে মোট ৩টি ব্রিজ নির্মান করা হবে। পুরাতন আদলে মন্দিরের সংস্কার কাজ চলছে। চলমান রয়েছে বৌদ্ধ মন্দিরের চতুর্দিকে ভিক্ষু কক্ষগুলি, মিনিয়েচার যার নমুনা ধরে বৌদ্ধ মন্দিরটি নির্মার করা হয়েছে, পঞ্চবেদী সহ সকল স্ট্রাকচার পুরাতন আদলে সংস্কার কাজ চলছে। পুরোপুরি কাজ সমাপ্ত হলে মন্দিরের ভিতর আর কখনো বৃষ্টির পানি ঢুকতে পারবে না। ফলে মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। এ বিষয়ে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার যাদুঘড় কাস্টডিয়ান মোঃ সাদেকুজ্জামান বলেন, পুরাতন আদলে ও আধুনিকায়ন ভাবে সংষ্কার করা হচ্ছে বৌদ্ধ বিহার। এতে বিহারের ভিতর আর কখনও বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে পারবে না। ফলে ওয়াল ডামেজ হওয়ার আর কোন ভয় নেই। সংষ্কারের পর দু এক বছর অতিবাহিত হলেই বৌদ্ধ বিহারের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত শতশত বছর এই নিভৃত পল্লী গ্রামে লুকিয়ে ছিল প্রাচীন বাংলার অজানা ইতিহাস। ইতিহাস সমৃদ্ধ এই বিহার যেন এখনও অমৃত্যের প্রতীক। ইংরেজ পত্মতাত্বিক বুকানন হামিলটন যখন পূর্ব ভারতে জরিপ কাজ পরিচালনা করেন (১৮০৭-১৮১২ খ্রিঃ)। এসময় তিনি পাহাড়পুরে এসে এই স্তুপটির এক পাশে লাল ইটের টুকরো দেখে তিনি অনুমান করেছিলেন এটি একটি বৌদ্ধ বিহার। সমতল ভুমি থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১৫০ ফুট। পাহাড়পুর খননের কাজ শুরু হয় ১৯২৩ সালে। তৎকালীন জমিদারের প্রচন্ড বাধার মুখেই সে সময় খনন কাজ করতে হয়। খনন শেষ হয় ১৯৩৪ সালে, খনন কাজ করার সময় পাওয়া একটি মাটির সীলমোহর থেকে এর নাম পাওয়া যায় সোমপুর বৌদ্ধ বিহার। ঐতিহাসিক তথ্যে জানা যায় পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল অষ্টম শতকের শেষের দিকে এ বিহার নির্মান করেছিলেন। নবম শতকে পাহাড়পুর বিহার পাল রাজাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। প্রতিহার রাজা মহেন্দ্র পাল এটি দখল করেন। পরে আনুমানিক ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে পাল রাজা প্রথম মহীপাল বিহার পুনরুদ্ধার করেন। ১১ শতকে বিহারের উপর আবার আঘাত আসে। এ সময় বিহারে আগুন লাগলে বৌদ্ধ ভিক্ষু করুনাস্ত্রী তাতে দগ্ধ হয়। ১১ শতকের শেষ ভাগে রাজা রামপাল বিহারটি সংস্কার করেন। পাল রাজত্বের আমলেই আবারও বিহারটি অবহেলার শিকার হয়। বিহারের আয়তন উত্তর দক্ষিনে ৯২২ ফুট পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৯ ফুট। সারা পৃথিবীতে এ পর্যন্ত জ্যামিতিক নকশার পুরাকির্ত্তীর সন্ধান পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহারের নকসা তার মধ্যে সেরা। কারও কারও মতে এখানে একটি জৈন মন্দির ছিল। আর সেই মন্দিরের উপরেই গড়ে তোলা হয়েছে এ বিহার। এ বিহারের ১৩-১৪ ফুট আকারের মোট ১৭৭ টি ঘর রয়েছে। ঘরগুলোর সামনে টানা বারান্দা। উপরে প্রায় ১০ ফুট চওড়া ছাদ। ওগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বাস করতেন। বিহারের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি মন্দির। মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ৪০০ ফুট এবং প্রস্থে প্রায় ৩৫০ফুট, উচ্চতায় ৭০ ফুট। কালের পরিক্রমায় মন্দিরের সবচেয়ে উপরের অংশ ধ্বসে গেছে। বাইরের দেয়ালে বুদ্ধমূর্তি, হিন্দুদের দেবীমূর্তি ও প্রচুর পোড়ামাটির ফলক চিত্র রয়েছে। এসব চিত্রে সাধারন মানুষের জীবন গাঁথা বিচিত্র রয়েছে। বিহারের মূল বেষ্টনীর দেয়াল প্রায় ২০ফুট চওড়া। বেষ্টনীর মধ্যে রয়েছে আরেকটি মন্দির। এটি মূল মন্দিরের ধ্বংসস্তুপ। এছাড়া আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু স্থাপত্যের নিদর্শন। এক পাশে রয়েছে পাকা কুয়া। কুয়ার সঙ্গেই খাবার ঘর। দক্ষিন দিককার ঘরগুলোর আরো দক্ষিনে সামনা সামনি আরেকটি মন্দির। এটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৮ ফুট, প্রস্থে ৩০ ফুট। দক্ষিন দিককার ১০২ নং ঘরের মধ্যে দিয়ে একটি পথ ছিল প্রায় ৪১ ফুট নিচে নেমে যাওয়া একটি ঘাট রয়েছে এখানে। ঘাটটি ইট ও পাথর দিয়ে বাধানো। এটি বিহার থেকে ১৬০ ফুট দূরে। এখানে এক সময় যে নদী ছিল তা চিহ্ন দেখে বোঝা যায়। ঘাটটি নিয়ে এলাকায় জনশ্রুতি আছে। এই ঘাটে মৈদলন রাজার কন্যা সন্ধ্যাবতী স্নান করতো বলে এ ঘাটের নাম ছিল সন্ধ্যাবতীর ঘাট। একদিন নদীর স্রোতে ভেসে আসা জবা ফুলে ঘ্রান নেয়ার পরে সন্ধ্যাবতী গর্ভবতী হয় এবং পরবর্তীতে ছেলে সন্তান প্রসব করেন।
এখানে রয়েছে একটি যাদুঘরঃ নরওয়ে সরকারের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের প্রত্মতত্ব ও যাদুঘর অধিদপ্তরের তত্ববধানে এখানে ১৯৯৩ সালে যাদুঘর তৈরী হয়। ১৯৯৫ সালে সবার জন্য এটি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। যাদুঘরে দেখা মিলবে প্রাচীন মুদ্রা, সাড়ে ৩ হাজার পোড়া মাটির ফলকচিত্র, সিলমোহর, পাথরের মূর্তি, তাম্রলিপি, শিলালিপি ইত্যাদি। বিহারের ১২৫ নং কক্ষে পাওয়া খলিফা হারুন অর রশিদ এর শাসনামলের রুপার মুদ্রা। ১৯৮৩ সালে পাওয়া যায় ব্রোঞ্জের তৈরী একটি আবদ্ধ বৌদ্ধ মূর্তি।

বিশিষ্ট ব্যক্তির পরিদর্শনঃ সংরক্ষনের ফলে পাহাড়পুর শুধু দর্শনীয় এবং অতীত ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবেই নয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিশেষ স্থান হিসেবেও দেশে-বিদেশে খ্যাতি পেয়েছে। দেশী-বিদেশী অনেক প্রত্মতাত্বিক ছাড়াও এ বিহার পরিদর্শনে এসেছেন স্পেনের রানী সোফিয়া, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসা, থাইল্যান্ডের যুবরাজ এবং জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব পেরেজ দ্য কুয়েলার।
কিভাবে যাবেনঃ পাহাড়পুর যেতে নওগাঁ এবং জয়পুরহাট এই দুই জেলা দিয়েই যাওয়া যায়। নওগাঁ এবং জয়পুরহাটে যাওয়ার জন্য ঢাকার গাবতলী থেকে সরাসরি বাস সার্ভিস রয়েছে ভাড়া ৫০০-৬০০ টাকা। নওগাঁ থেকে বদলগাছীর ভাড়া ৩০ টাকা । বদলগাছী থেকে ৪০-৫০ টাকায় রিক্সা ভ্যানে চড়ে সোজা পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার ফাঁকা জায়গার মধ্যে দাড়িয়ে রয়েছে সত্যিই পাহাড়ের মতো, আর তাইতো এটা পাহাড়পুর কাজেই বেরিয়ে পড়ুন এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর দেখার জন্য।
কোথায় থাকবেন: ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ পাহাড়পুরে থাকার কোন ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নেই। প্রত্মতত্ব বিভাগের একটি রেস্ট হাউস আছে কিন্তু সেখানে রাতে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। আপনাকে হয় বদলগাছী ডাকবাংলো নয়তোবা নওগাঁ বা জয়পুরহাটেই থাকতে হবে। এই দুই শহরে থাকার জন্য ভালো হোটেল আছে। ভাড়া ৩০০-৪০০ টাকা। তথ্য সংগ্রহ কালে এ প্রতিবেদককে সার্বিক সহযোগিতা করেন পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের সংষ্কার ও সংরক্ষন কাজে তদারকির দায়ীত্বে নিয়েজিত ইঞ্জিনিয়ার নজমুল হোসাইন, আল হেলাল, রেজা আহমেদ, আমিনুল ইসলাম, আকরাম হোসেন ও ভাতিজা আলমগীর হোসেন (বাদল)।