Pages

Categories

Search

আজ- মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

এক শ্রমিক আরেক শ্রমিকের কপাল পুড়তে পারে না ?

RS_Gazipur_Pic-_29-11-2013_(12_(1)[2]

আবু বকর সিদ্দিক আকন্দ :

প্রতি মাসের ২৫ তারিখ থেকে বেতন দেওয়া শুরু হয়, চলে পরবর্তী মাসের ৫ তারিখ পর্যন্ত। আমরা নদী ভাঙ্গন এলাকার মানুষ। ২৪ হাজার শ্রমিক একসাথে একই চত্বরে কাজ করি। এর সাথে ২৪ হাজার পরিবারের রুটি রুজি জড়িত।

গত ১০ বছরে আমি গার্মেন্টটাকে আমার পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে দেখছি। আমার স্ত্রীও এ কারখনায় কাজ করেন। এখন পরিবারের একজন সদস্যকে হারিয়ে আমি বোবা হয়ে গেছি। আমার মুখে কোনো ভাষা নেই। বৃহস্পতিবার রাতে আগুন লাগার পর আজ শনিবার দুপুরে আমার এক প্রতিবেশীর বাসায় খেয়েছি।

গাজীপুর জেলার কোণাবাড়ী জরুন রোডের স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টেস লিমিটেডের গেটের সামনে চা স্টলে একজন শ্রমিক এ কথাগুলোই বলছিলেন। গার্মেন্টটি পুড়ে যাওয়ার ঘটনা বলার সময় তিনি কয়েকবার চোখের জল মুছতে ছিলেন। তার নাম মেলাল হোসেন। তিনি ওই কারাখানার কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলা সদরে।

তিনি জানান, এ কারখানার প্রত্যেকটি শ্রমিক গার্মেন্টটিকে তার সন্তানের মতো মনে করেন। এরকম ভেবেই তারা কারখানায় কাজ করে আসছেন।

স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টের সুইং অপারেটর রঞ্জনা(২৮)। তিনি গত ১০ বছর যাবতক  প্রতিষ্ঠানটিতে চাকুরী করছেন। তিনি ৬ মাসের সন্তান সম্ভবা। তার ¯^ামী জাহাঙ্গীর আলম চাকুরী করেন কালিয়াকৈর উপজেলার আরেকটি গার্মেন্ট কারখানায়। টল টল জল নিয়ে চোখের পলক না ফেলে বলেন, আমি আগামী মাসে আমার ভবিষ্যত সন্তানের জন্য এককালীন একটা ভাতা পাওয়ার আশায় ছিলাম। আমার প্রতিষ্ঠানের মালিক আমাকে এরকম প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ……….এরপর তিনি আর কিছু বলতে না পেরে চোখের পলক ফেলে চোখ মুছতে মুছতে তার সহকর্মীদের আড়াল হয়ে যান। এসময় তার বক্তব্য শুনে তার অন্য সহকর্মীরাও কান্না করে চোখ মুছতে থাকেন।

চোখ মুছে ক্ষোভের ¯^রে সুইং হেলপার মীনা বলেন, স্ট্যান্ডার্ড কারখানার কোনো শ্রমিক জেনেশুনে তার নিজ হাতে কোনো অবস্থাতেই কারখানার গায়ে আগুন লাগাতে পারে না। এ কাজটি বহিরাগত কোনো শ্রমিকও করেনি। যারা কারখানাটি আগুনে পুড়িয়েছে তারা অবশ্যই শুধু স্ট্যান্ডার্ড কারখানার নয়, সকল শ্রমিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি কামনা করেছে। এক শ্রমিক আরেক শ্রমিকের কপাল পুড়তে পারেনা। চলতি মাসের প্রথম দিকে কারখানাটি মজুরী বৃদ্ধির আন্দোলনের জন্য চারদিন বন্ধ ছিল। মালিকপক্ষ সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলে সকল শ্রমিক কাজে যোগ দেয়। তাহলে আগুনটা লাগালো কে? আমাদের পেটে কে লাথি দিল? আপনারা তাদের খোঁজে বের করে আমাদের গার্মেন্ট ফিরিয়ে দেন।

কারখানার কাটিং বিভাগের মার্কারম্যান তাশলিমা। সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর থানার ডিক্রীদূরতা গ্রামে তার বাড়ি। তিন বছরের এক ছেলেকে মা-বাবার কাছে রেখে ¯^ামীসহ এখানে চাকুরী করছেন। তিনি জানান, দু’জনেই বেশ ভাল উপার্জন করে শ্বশুড়-শ্বাশুড়ী ও সন্তানের জন্য বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছি। আগামী ২ ডিসে¤^র বেতন পাওয়ার তারিখ ছিল। এ মাসে কী করব ভাবতে পারছিনা।

তাশলিমার ¯^ামী আবু ইউসুফ বলেন, গত ১৩ নভে¤^র সোয়েটার কারখানার শ্রমিকেরা স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টের পাশে বালুর মাঠে বিকেলে মিটিংয়ে বসছিল। পিস রেট বাড়ানোর দাবীতে আন্দোলনের পরিকল্পনা সভায় এলাকার স্থানীয় লোকজন ওই মিটিংয়ে হামলা করে বেশ কয়েকজন শ্রমিককে আহত করে। এর প্রতিবাদে পরদিন ১৪ নভে¤^র শ্রমিকেরা স্ট্যান্ডার্ড কারখানার সামনে কয়েকটি দোকানপাট ভাংচুর ও কাঁচা বাজারের ৩০টি দোকানে অগ্নিসংযোগ করে। এরপর থেকে কারখানাটি বেশ ভাল চলছিল।

কারখানার একাধিক শ্রমিক জানান, ২৮ নভে¤^র রাত ১০টার দিকে ৪০ থেকে ৫০ জন লোক কারখঅনার সামনের রাস্তায় “আমাদের দাবী মানতে হবে, ডাইরেক্ট অ্যাকশন” বলে শ্লোগান দিয়ে কয়েকবার প্রদক্ষিণ করে। তারা কারা এবং তাদের দাবীটা কি ছিল সে ব্যাপারে শ্লোগানে বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না। তারাই কারখানার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। এসময় পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে। এক পর্যায়ে তারা স্থানীয় মসজিদের মাইকে দুই শ্রমিক নিহতের গুজব প্রচার করে। মাইকে ঘোষনার কিছুক্ষণ পরই রাত সাড়ে ১১টার দিকে কারখানায় প্রবেশ করে। তারা কারখানায় রক্ষিত কাভার্ড ভ্যানসহ সকল গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। পরে কারখানার ভেতরের পেট্রল পাম্প থেকে পেট্রল ছিটিয়ে মুখোশ পরিহিত অবস্থায় কারখানার মূল ভবনের প্রত্যেক তলায় আগুন ধরিয়ে দেয়।

স্ট্যান্ডার্ড শিল্প গ্রæপের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক নূর-ই আলম জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় কারখানা যথারীতি ছুটি দেওয়া হয়। অধিকাংশ শ্রমিক কারখানা ছেড়ে চলে যায়। তবে শিপমেন্টের জন্য প্রায় দুইশ’র মতো শ্রমিক কারখানায় কাজ করছিল। তিনি জানান, ২০০২ সনে ১৫’শ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড শিল্প গ্রæপটি চালু হয়। ১০ তলা মূল ভবনের প্রতিটি ফ্লোর ৭৫ হাজার স্কয়ার ফিটের। প্রতিটি ফ্লোরে তৈরী করা ও প্রাক প্রস্তুতির ফেব্রিক্স ছিল। আগুনে সব পুড়ে গেছে।

স্ট্যান্ডার্ড শিল্প গ্রæপের প্রধান কার্যালয়ের মহা ব্যবস্থাপক রেজাউল করিম জানান, ওই রাত সাড়ে ১২টার সময় কারখানার শিপটমেন্টের জন্য ১৮টি কাভার্ড ভ্যান লোড করে রাখা হয়েছিল। শ্রমিকেরা ওই কাভার্ড ভ্যানগুলোতে আগুন দেয়। একই সাথে কারখানা চত্বরে রাখা প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ছোট কাভার্ড ভ্যানসহ ১৩টি গাড়িতে আগুন দেয়। আগুনে সবগুলো গাড়ী ও শিপমেন্টের জন্য তৈরী করা মালামাল পুড়ে যায়। গাড়িতে আগুনের পাশাপাশি শ্রমিকেরা কারখানার মূল প্রশাসনিক ভবনসহ তিনটি ভবনে আগুন দেয়।

গাজীপুর সিভিল ডিফেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক আখতারুজ্জামান লিটন জানান, ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা হেডকোয়ার্টারসহ ১২টি ইউনিট অগ্নিসংযোগের আধাঘন্টা পর থেকেই আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। শুক্রবার দুপুর ১টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে শনিবারও পুরোপুরি আগুন নেভানো স¤^ব হয়নি। কারখানার কয়েকটি ফ্লোরে চাপা পড়ে থাকা দগ্ধ তুলার মধ্যে পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে শনিবার পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমান জানাতে পারেননি দমকল বাহিনীর কর্মকর্তারা।

স্ট্যান্ডার্ড শিল্প গ্রæপে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গাজীপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো: মহসিনকে প্রধান করে শিল্প পুলিশ, দমকল বাহিনীর কর্মকর্তাসহ সাতজনকে এ কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মো: মোশাররফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ ও পরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা একটি পরিকল্পিত নাশকতার আভাস। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

শনিবার হাজার হাজার শ্রমিক কারখানার গেটে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে কারখানার ভবন দেখছেন। কারখানার মূল ভবনের প্রত্যেকটি তলা ঘুরে দেখা গেছে, জানালার কাঁচগুলো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। হঠাৎ করে জানালায় ঝুলে থাকা কিছু কাঁচ নিচে পড়ছে। তুলার যে সব স্তুপ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে সেসব স্থানে দমকল বাহিনীর কর্মীরা পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন। আগুন নেভঅনোর জন্য যেসব পানি ফ্লোরে জমে রয়েছে সেগুলো ভবনের ছাদ চুঁইয়ে পড়ছে। ছাদগুলোতে একাধিক ফাটল দেখা দিয়েছে। ভেতর বাহির একাধিকস্থানে পিলার ও দেয়ালের মধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। কারখানার নিরাপত্তার কর্মীরা ঝুঁকি এড়াতে দমকল বাহিনীর কর্মী ছাড়া অন্য কাউকে ভবনের ভেতর প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।